অধিচেতনা

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য। আপনার কথা শুনিলে মহা সাহসের সঞ্চার হয়—উৎসাহ, বল ও তেজে হৃদয় ভরিয়া যায়।
স্বামীজী। হৃদয়ে ক্রমে ক্রমে বল আনতে হবে। একটা ‘মানুষ’ যদি তৈরি হয়, তো লাখ বক্তৃতার ফল হবে। মন-মুখ এক করে idea (ভাব)-গুলি জীবনে ফলাতে হবে। এর নামই ঠাকুর বলতেন ‘ভাবের ঘরে চুরি না থাকা।’ সব দিকে practical হতে (কর্মের ভেতর দিয়ে মতে বা ভাবের বিকাশ দেখাতে) হবে। Theory-তে theory-তে (মতে মতে) দেশটা উচ্ছন্ন হয়ে গেল।
লোকের বা সমাজের কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে আপন মনে কাজ করে যাবে। তুলসীদাসের দোহায় আছে শুনিসনি—
“হাতী চলে বাজার-কুত্তা ভুকে হাজার। সাধুকো দুর্ভাব নেহি যব্ নিন্দে সংসার ॥”
এই ভাবে চলতে হবে। লোককে জানতে হবে পোক্। তাদের ভালমন্দ কথায় কান দিলে জীবনে কোন মহৎ কাজ করতে পারা যায় না। “নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ”—শরীরে, মনে বল না থাকলে এই আত্মা লাভ করা যায় না। পুষ্টিকর উত্তম আহারে আগে শরীর গড়তে হবে, তবে তো মনে বল হবে। মনটা শরীরেরই সূক্ষ্মাংশ। মনে-মুখে খুব জোর করবি। “আমি হীন, আমি হীন” বলতে বলতে মানুষ হীন হয়ে যায় ….—যার ‘মুক্ত’-অভিমান সর্বদা জাগরূক, সে-ই মুক্ত হয়ে যায় ; যে ভাবে ‘আমি বদ্ধ, জানবি জন্মে জন্মে তার বন্ধন-দশা। ঐহিক, পারমার্থিক উভয় পক্ষে ঐ কথা সত্য জানবি । ইহজীবনে যারা সর্বদা হতাশচিত্ত, তাদের দ্বারা কোন কাজ হতে পারে না; তারা জন্ম জন্ম হা-হুতাশ করতে করতে আসে ও যায়। ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’—বীরই বসুন্ধরা ভোগ করে, একথা ধ্রুব সত্য। ‘বীর হ’—সর্বদা বল্ ‘অভীঃ’ ‘অভীঃ’। সকলকে শোনা ‘মাভৈঃ’ ‘মাভৈঃ’—ভয়ই মৃত্যু, ভয়ই পাপ, নরক, ভয়ই অধর্ম, ভয়ই ব্যভিচার। জগতে যত কিছু negative thoughts (অসৎ বা মিথ্যা ভাব) আছে, সে-সকলই এই ভয়রূপ শয়তান থেকে বেরিয়েছে।
স্বামীজী আবার বলিতে লাগিলেন, “এই দেহধারণ করে কত সুখ-দুঃখে—কত সম্পদ-বিপদের তরঙ্গে আলোড়িত হবি। কিন্তু জানবি, ওসব মুহূর্তকাল স্থায়ী। ঐসকলকে গ্রাহ্যের ভেতর আনবি নে, ‘আমি অজর অমর চিন্ময় আত্মা’ এই ভাব হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করতে হবে। ‘আমার জন্ম নেই, আমার মৃত্যু নেই, আমি নির্লেপ আত্মা’–এই ধারণায় একেবারে তন্ময় হয়ে যা। একবার তন্ময় হয়ে যেতে পারলে দুঃখ-কষ্টের সময় আপনা-আপনি ঐ ভাব মনে উঠে পড়বে—চেষ্টা করে আর আনতে হবে না।
শিষ্য। মহাশয়, আপনার সবই অদ্ভুত !
স্বামীজী। অদ্ভুত বলে বিশেষ একটা কিছু নেই। অজ্ঞানতাই অন্ধকার। তাতেই সব ঢেকে রেখে অদ্ভুত দেখায়। জ্ঞানালোকে সব উদ্ভিন্ন হলে কিছুরই আর অদ্ভুতত্ব থাকে না। এমন যে অঘটন-ঘটন-পটিয়সী মায়া, তাও লুকিয়ে যায়। যাঁকে জানলে সব জানা যায়, তাঁকে জান—তাঁর কথা ভাব—সে আত্মা প্রত্যক্ষ হলে শাস্ত্রার্থ ‘করামলকবৎ’ প্রত্যক্ষ হবে। পুরাতন ঋষিগণের হয়েছিল, আর আমাদের হবে না? আমরাও মানুষ। একবার একজনের জীবনে যা হয়েছে, চেষ্টা করলে তা অবশ্যই পুনরায় অপরের জীবনেও সিদ্ধ হবে। History repeats itself—যা একবার ঘটেছে, তাই বার বার ঘটে। এই আত্মা সর্বভূতে সমান। কেবল প্রতি ভূতে তাঁর বিকাশের তারতম্য আছে মাত্র। এই আত্মাকে বিকাশ করবার চেষ্টা কর। দেখবি, বুদ্ধি সব বিষয়ে প্রবেশ করবে।
আত্মার প্রকাশ হলে দেখবি, দর্শন, বিজ্ঞান সব আয়ত্ত হয়ে যাবে। সিংহগর্জনে আত্মার মহিমা ঘোষণা কর, জীবকে অভয় দিয়ে বল—“উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত”—Arise ! awake ! and stop not till the goal is reached.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *