গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ যখন চিকাগো প্রভৃতি শহরে বক্তৃতা শুরু করলুম, তখন সপ্তাহে ১২/১৪টা, কখনো আরও বেশি লেকচার দিতে হতো। অত্যধিক শারীরিক ও মানসিক শুনে মহাক্লান্ত হয়ে পড়লুম। যেন বক্তৃতার বিষয় সব ফুরিয়ে যেতে লাগল। ভাবতুম—কি করি, কাল আবার কোথা থেকে কি নূতন কথা বলব? নূতন ভাব আর যেন জুটত না। একদিন বক্তৃতার পরে শুয়ে শুয়ে ভাবছি—তাই তো, এখন কি উপায় করা যায়? ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রার মতো এল। সেই অবস্থার শুনতে পেলুম, কে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছে কত নূতন ভাব, নূতন কথা—সে সব যেন ইহজন্মে শুনিনি, ভাবিওনি! ঘুম থেকে উঠে সেগুলি স্মরণ করে রাখলুম, আর বক্তৃতায় তাই বললুম। এমন যে কতদিন ঘটেছে, তার সংখ্যা নেই। শুয়ে শুয়ে এমন বক্তৃতা কতদিন শুনেছি! কখনো বা এত জোরে জোরে বক্তৃতা হতো যে, অন্য ঘরের লোক আওয়াজ পেত ও পরদিন আমায় বলত, ‘স্বামীজী, কাল অত রাত্রে আপনি কার সঙ্গে এত জোরে কথা কচ্ছিলেন ?’ আমি তাদের সে-কথা কোনরূপে কাটিয়ে দিতুম। সে এক অদ্ভুত কাণ্ড!”
শিষ্য স্বামীজীর কথা শুনিয়া নির্বাক হইয়া ভাবিতে ভাবিতে বলিল—“মহাশয়, তবে বোধ হয় আপনিই সূক্ষ্মদেহে ঐরূপে বক্তৃতা করিতেন এবং স্থূলদেহে কখনো কখনো তার প্রতিধ্বনি বাহির হইত।” শুনিয়া স্বামীজী বলিলেন, “তা হবে’। অনন্তর আমেরিকার কথা উঠিল। স্বামীজী বলিলেন, “সে-দেশের পুরুষের চেয়ে মেয়েরা অধিক শিক্ষিতা। বিজ্ঞান-দর্শনে তারা সব মহাপণ্ডিত ; তাই তারা আমায় অত খাতির করত। পুরুষগুলো দিনরাত খাটছে, বিশ্রামের সময় নেই; মেয়েরা স্কুলে অধ্যয়ন-অধ্যাপনা করে মহাবিদুষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকায় যেদিকে চাইবি, কেবলই মেয়েদের রাজত্ব।”
শিষ্য। আচ্ছা মহাশয়, গোঁড়া ……….. সেখানে আপনার বিপক্ষ হয় নাই ?
স্বামীজী। হয়েছিল বই কি! আবার যখন লোকে আমায় খাতির করতে লাগল, তখন পাদরীরা আমার পেছনে খুব লাগল। আমার নামে কত কুৎসা কাগজে লিখে রটনা করেছিল। কত লোক আমায় তার প্রতিবাদ করতে বলত। আমি কিন্তু কিছু গ্রাহ্য করতুম না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস — চালাকি দ্বারা জগতে কোন মহৎ কার্য হয় না ; তাই ঐসকল অশ্লীল কুৎসায় কর্ণপাত না করে ধীরে ধীরে আপনার কাজ করে যেতুম। দেখতেও পেতুম, অনেক সময়ে যারা আমায় অযথা গালমন্দ করত, তারাও অনুতপ্ত হয়ে আমার শরণ নিত এবং নিজেরাই কাগজে contradict (প্রতিবাদ) করে ক্ষমা চাইত। কখনো কখনো এমনও হয়েছে – আমায় কোন বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছে দেখে কেউ আমার নামে ঐ সকল মিথ্যা কুৎসা বাড়িওয়ালাকে শুনিয়ে দিয়েছে। তাই শুনে সে দোর বন্ধ করে কোথায় চলে গেছে।
আমি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে দেখি—সব ভোঁ ভা—কেউ নেই। আবার কিছুদিন পরে তারাই সত্য কথা জানতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে আমার চেলা হতে এসেছে। কি জানিস বাবা, সংসার সবই দুনিয়াদারি! ঠিক সৎসাহসী ও জ্ঞানী কি এসব দুনিয়াদারিতে ভোলে রে বাপ ! জগৎ যা ইচ্ছে বলুক, আমার কর্তব্য কার্য করে চলে যাব—এই জানবি বীরের কাজ। নতুবা এ কি বলছে, ও কি লিখছে, ও-সব নিয়ে দিনরাত থাকলে জগতে কোন মহৎ কার্য করা যায় না।
