আপনা আপনি সহসা হয়ে যেত। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। তাঁকে দেখেই তো এসব ঠিক ঠিক বুঝতে পেরেছিলুম। প্রত্যহ একাকী ধ্যান করবি। সব আপনা আপনি খুলে যাবে। বিদ্যারূপিণী মহামায়া ভেতরে ঘুমিয়ে রয়েছেন, তাই সব জানতে পাচ্ছিস না। ঐ কুলকুণ্ডলিনীই হচ্ছেন তিনি।
গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ
লেগে থাকতে হয়—নাছোড়বান্দা হয়ে। এর নাম যথার্থ পুরুষকার।
তৈলধারার মতো মনটা এক বিষয়ে লাগিয়ে রাখতে হয়।
জীবের মন নানা বিষয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, ধ্যানের সময়ও প্রথম প্রথম মন বিক্ষিপ্ত হয়। মনে যা ইচ্ছে উঠুক না কেন, কি কি ভাব উঠছে সেগুলি তখন স্থির হয়ে বসে দেখতে হয়। ঐরূপে দেখতে দেখতেই মন স্থির হয়ে যায়, আর মনে নানা চিন্তাতরঙ্গ থাকে না। ঐ তরঙ্গগুলোই হচ্ছে মনের সঙ্কল্পবৃত্তি ইতঃপূর্বে যে-সকল বিষয় তীব্রভাবে ভেবেছিস, তার একটা মানসিক প্রবাহ থাকে, ধ্যানকালে ঐগুলি তাই মনে ওঠে। সাধকের মন যে ক্রমে স্থির হবার দিকে যাচ্ছে, ঐগুলি ওঠা বা ধ্যানকালে মনে পড়াই তার প্রমাণ। মন কখনো কখনো কোন ভাব নিয়ে একবৃত্তিস্থ হয়—উহারই নাম সবিকল্প ধ্যান। আর মন যখন সর্ববৃত্তিশূন্য হয়ে আসে—তখন নিরাধার এক অখণ্ড বোধস্বরূপ প্রত্যক্চৈতন্যে গলে যায়। উহার নামই বৃত্তিশূন্য নির্বিকল্প সমাধি। আমরা ঠাকুরের মধ্যে এ উভয় সমাধি মুহুর্মুহুঃ প্রত্যক্ষ করেছি। চেষ্টা করে তাঁকে ঐ সকল অবস্থা আনতে হতো না।
আপনা আপনি সহসা হয়ে যেত। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। তাঁকে দেখেই তো এসব ঠিক ঠিক বুঝতে পেরেছিলুম। প্রত্যহ একাকী ধ্যান করবি। সব আপনা আপনি খুলে যাবে। বিদ্যারূপিণী মহামায়া ভেতরে ঘুমিয়ে রয়েছেন, তাই সব জানতে পাচ্ছিস না। ঐ কুলকুণ্ডলিনীই হচ্ছেন তিনি। ধ্যান করবার পূর্বে যখন নাড়ী শুদ্ধ করবি, তখন মনে মনে মূলাধারস্থ কুণ্ডলিনীকে জোরে জোরে আঘাত করবি আর বলবি, ‘জাগ মা’, ‘জাগ মা’। ধীরে ধীরে এসব অভ্যাস করতে হয় ‘Emotional side-টে (ভারপ্রবণতা) ধ্যানের কালে একেবারে দাবিয়ে দিবি। ঐটের বড় ভয়। যারা বড় emotional (ভাবপ্রবণ), তাদের কুণ্ডলিনী ফড় ফড় করে ওপরে ওঠে বটে, কিন্তু উঠতেও যতক্ষণ নাবতেও ততক্ষণ। যখন নাবেন, তখন একেবারে সাধককে অধঃপাতে নিয়ে গিয়ে ছাড়েন। এজন্য ভাব-সাধনার সহায় কীর্তন-ফীর্তনের একটা ভয়ানক দোষ আছে। নেচেকুঁদে সাময়িক উচ্ছ্বাসে ঐ শক্তির ঊর্ধ্বগতি হয় বটে, কিন্তু স্থায়ী হয় না, নিম্নগামিনী হবার কালে জীবের ভয়ানক কামবৃত্তির আধিক্য হয়। আমার আমেরিকার বক্তৃতা শুনে সাময়িক উচ্ছ্বাসে মেয়েগুলো ছেলেগুলোর মধ্যে অনেকের ভাব হতো—কেউ বা জড়বৎ হয়ে যেত। আমি অনুসন্ধানে পরে জানতে পেরেছিলাম, ঐ অবস্থার পরই অনেকের কাম-প্রবৃত্তির আধিক্য হতো। স্থির ধ্যানধারণার অনভ্যাসেই ওরূপ হয়।
শিষ্য। ……মহাশয়, এসকল গুহ্য সাধন-রহস্য কোন শাস্ত্রে পড়ি নাই। আজ নূতন কথা শুনিলাম।
স্বামীজী। …..সব সাধন-রহস্য কি আর শাস্ত্রে আছে ? এগুলি গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় গুপ্তভাবে চলে আসছে। খুব সাবধানে ধ্যানঋরণা করবি। সামনে সুগন্ধি ফুল রাখবি, ধুনা জ্বালবি। যাতে মন পবিত্র হয়, প্রথমতঃ তাই করবি। গুরু ইষ্টের নাম করতে করতে বলবি—জীব জগৎ সকলের মঙ্গল হোক। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম অধঃ ঊর্ধ্ব সব দিকেই শুভ সঙ্কল্পের চিন্তা ছড়িয়ে তবে ধ্যানে বসবি। এইরূপ প্রথম প্রথম করতে হয়।
