অধিচেতনা

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউ এ পি ডিজিটাল ডেস্কঃ
তোমরা আধ মাইল পথ হাঁটিতে পার না, হনুমানের মতো সমদ্র পার হইতে চাহিছে ৷ তাহা কখনই হইতে পারে না। সকলেই যোগী হইতে চায়, সকলেই ধ্যান করিতে অগ্রসর। তাহা হইতেই পারে না। সারাদিন সংসারের সঙ্গে — কর্মকাণ্ডে মিশিয়া সন্ধ্যাবেলায় খানিকটা বসিয়া নাক টিপিলে কি হইবে? এ কি এতই সোজা ব্যাপার নাকি—তিনবার নাক টিপিয়াছ, আর অমনি ঋষিগণ উড়িয়া আসিবেন । এ কি তামাশা ? এ-সব অর্থহীন বাজে কথা ।
আবশ্যক – চিত্তশুদ্ধি। কিরূপে এই চিত্ত- শদ্ধি হইবে? প্রথম পাজা-বিরাটের পাজা; তোমার সম্মুখে — তোমার চারিদিকে যাঁহারা রহিয়াছেন, তাঁহাদের পাজা ; ইহাদের পূজো করিতে হইবে – সেবা নহে; ‘সেবা’ বলিলে আমার অভিপ্রেত ভাবটি ঠিক বুঝাইবে না, ‘পাজা’ শব্দেই ঐ ভাবটি ঠিক প্রকাশ করা যায়। এই-সব মানষ ও পশ, – ইহারাই তোমার ঈশ্বর, আর তোমার স্বদেশবাসি- গণই তোমার প্রথম উপাস্য। পরস্পরের প্রতি দ্বেষ-হিংসা পরিত্যাগ করিয়া ও পরস্পর বিবাদ না করিয়া প্রথমেই এই স্বদেশবাসিগণের পূজো করিতে হইবে। তোমরা নিজেদের ঘোর কুকর্মের ফলে কষ্ট পাইতেছ, এত কষ্টেও তোমরা চোখ খুলিবে না…..তোমরা এখন বে- শিক্ষা পাইতেছ, তাহার কতকগুলি গুণ আছে বটে, কিন্তু, আবার কতকগুলি বিশেষ দোষও আছে, আর দোষগুলি এত বেশী যে, গণভাগ নগণ্য হইয়া যায়। প্রথমতঃ ঐ শিক্ষায় মানুষে তৈরী হয় না- ঐ শিক্ষা সম্পূর্ণ নাস্তিভাবপূর্ণ ।
এইরূপে শিক্ষায় অথবা অন্য যে-কোন নেতিমূলক শিক্ষায় সব ভাঙিয়া-চারিয়া যায়—মৃত্যু অপেক্ষাও তাহা ভয়ানক। বালক কালে গিয়া প্রথমেই শিখিল— তাহার বাপ একটা মুখ, দ্বিতীয়তঃ তাহার পিতামহ একটা পাগল, তৃতীয়তঃ প্রাচীন আর্যগণ সব আর চতুর্থতঃ শাস্ত সব মিথ্যা। ষোল বৎসর বয়স হইবার পর্বেই সে একটা প্রাণহীন, মেরুদণ্ডহীন ‘না’-এর সমষ্টি হইয়া দাঁড়ায়। ইহার ফল এই দাঁড়াইয়াছে যে, পঞ্চাশ বৎসরের এইরূপ শিক্ষায় ভারতের তিনটি প্রেসিডেন্সির ভিতরে মৌলিক চিন্তাযক্ত একটি মানুষেও পাওয়া যায় না। যিনি মৌলিক ভাবপূর্ণে, তিনি অন্যত্র শিক্ষালাভ করিয়াছেন – এদেশে নয়; অথবা তিনি নিজেকে কুসংস্কার হইতে মক্ত করিবার জন্য প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করিয়াছেন। মাথায় কতকগুলি তথ্য ঢুকানো হইল, সারা- জীবন হজম হইল না, অসম্বদ্ধভাবে সেগুলি মাথায় ঘুরিতে লাগিল—ইহাকে শিক্ষা বলে না। বিভিন্ন ভাবকে এমনভাবে নিজের করিয়া লইতে হইবে, যাহাতে আমাদের জীবন গঠিত হয়, যাহাতে মানুষ তৈরী হয়, চরিত্র গঠিত হয়। যদি তোমরা পাঁচটি ভাব হজম করিয়া জীবন ও চরিত্র ঐভাবে গঠিত করিতে পারো, তবে যে-ব্যক্তি একটি গ্রন্থা- গারের সবগুলি পাতকে ম,খস্থ করিয়াছে,

তাহার অপেক্ষা তোমার অধিক শিক্ষা হইয়াছে বলিতে হইবে। ‘যথা খরশ্চন্দনভারবাহী ভারসা বেত্তা ন ত চন্দনস্য। চন্দনভারবাহী গর্দভ যেমন উহার ভারই বদঝিতে পারে, অন্যান্য গুণ বুঝিতে পারে না, ইত্যাদি ।যদি শিক্ষা বলিতে শধে, কতকগুলি বিষয় জানা বুঝায়, তবে লাইব্রেরিগুলিই তো জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, অভিধানসমূহই তো ঋষি। সূতরাং আদর্শ এই হওয়া উচিত যে, আমাদের আধ্যাত্মিক ও লৌকিক সর্বপ্রকার শিক্ষা নিজেদের হাতে লইতে হইবে এবং যতদূর সম্ভব জাতীয়ভাবে ঐ শিক্ষা দিতে হইবে অবশ্য ইহা একটি গুরুতর ব্যাপার—কঠিন সমস্যা। জানি না, ইহা কখন কার্যে পরিণত হইবে কিনা । কিন্তু, আমাদিগকে কাজ আরম্ভ করিয়া দিতে হইবে ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *