আধিচেতনা

কথাগুলি বলিয়া স্বামীজী এলোথেলোভাবে বসিয়া তামাক খাইতে খাইতে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকিলেন। কিছুক্ষণ বাদে বলিলেন, “আমি এত তপস্যা করে এই সার বুঝেছি যে, জীবে জীবে তিনি অধিষ্ঠান হয়ে আছেন; তা ছাড়া ঈশ্বর-ফিশ্বর কিছুই আর নেই। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য। ….মহাশয়, এদেশে লোকের ভিতর এত বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাব—ইহাদের ভিতর সকলের মিল হওয়া যে বড় কঠিন ব্যাপার ।

স্বামীজী।…… (সক্রোধে) কঠিন বলে কোন কাজটাকে মনে করলে হেথায় আর আসিসনি। ঠাকুরের ইচ্ছায় সব দিক সোজা হয়ে যায়। তোর কার্য হচ্ছে দীনদুঃখীর সেবা করা জাতিবর্ণনির্বিশেষে। তার ফল কি হবে না হবে, ভেবে তোর দরকার কি? তোর কাজ হচ্ছে কার্য করে যাওয়া, পরে সব আপনি আপনি হয়ে যাবে। আমার কাজের ধারা হচ্ছে— গড়ে তোলা, যা আছে সেটাকে ভাঙা নয়। জগতের ইতিহাস পড়ে দ্যাখ, এক একজন মহাপুরুষ এক-একটা সময়ে এক-একটা দেশে যেন কেন্দ্রস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের ভাবে অভিভূত হয়ে শতসহস্র লোক জগতের হিতসাধন করে গেছে। তোরা সব বুদ্ধিমান ছেলে, হেথায় এত দিন আসছিস। কি করলি বল দিকি ? পরার্থে একটা জন্ম দিতে পারলিনি ? আবার জন্মে এসে তখন বেদান্ত-ফেদান্ত পড়বি। এবার পরসেবায় দেহটা দিয়ে যা, তবে জানব—আমার কাছে আসা সার্থক হয়েছে।

কথাগুলি বলিয়া স্বামীজী এলোথেলোভাবে বসিয়া তামাক খাইতে খাইতে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকিলেন। কিছুক্ষণ বাদে বলিলেন, “আমি এত তপস্যা করে এই সার বুঝেছি যে, জীবে জীবে তিনি অধিষ্ঠান হয়ে আছেন; তা ছাড়া ঈশ্বর-ফিশ্বর কিছুই আর নেই। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।”

তবে এইটে জেনে রাখবি, সংসারে তুই বাঁচিস কি মরিস, তাতে তোর আত্মীয়-পরিজনদের বড় একটা কিছু আসে যায় না। তুই যদি কিছু বিষয়-আশয় রেখে যেতে পারিস তো তোর মরবার আগেই দেখতে পাবি, তা নিয়ে ঘরে লাঠালাঠি শুরু হয়েছে। তোর মৃত্যুশয্যায় সান্ত্বনা দেবার কেউ নেই—স্ত্রীপুত্র পর্যন্ত নয়। এর নামই সংসার !

মঠের পূর্বাবস্থা সম্বন্ধে স্বামীজী আবার বলিতে লাগিলেন, “খরচপত্রের অনটনের জন্য কখনো কখনো মঠ তুলে দিতে লাঠালাঠি করতুম। শশীকে কিন্তু কিছুতেই ঐ বিষয়ে রাজি করাতে পারতুম না। শশীকে আমাদের মঠে central figure (কেন্দ্রস্বরূপ) বলে জানবি। এক একদিন মঠে এমন অভাব হয়েছে যে, কিছুই নেই। ভিক্ষা করে চাল আনা হলো তো নুন নেই। এক একদিন শুধু নুন-ভাত চলেছে, তবু কারও ভূক্ষেপ নেই, জপধ্যানের প্রবল তোড়ে আমরা তখন সব ভাসছি। তেলাকুচোপাতা সেদ্ধ, নুন-ভাত—এই মাসাবধি চলেছে! আহা, সেসব কি দিনই গেছে ! সে কঠোরতা দেখলে ভূত পালিয়ে যেত—মানুষের কথা কি! এ কথাটা কিন্তু ধ্রুব সত্য যে, তোর ভেতরে যদি বস্তু থাকে তো যত circumstances against (অবস্থা প্রতিকূল) হবে, তত ভেতরের শক্তির উন্মেষ হবে। তবে এখন যে মঠে খাট-বিছানা, খাওয়া-দাওয়ার সচ্ছল বন্দোবস্ত করেছি তার কারণ—আমরা যতটা সইতে পেরেছি তত কি আর এখন যারা সন্ন্যাসী হতে আসছে তারা পারবে ? আমরা ঠাকুরের জীবন দেখেছি, তাই দুঃখ-কষ্ট বড় একটা গ্রাহ্যের ভেতর আনতুম না । এখনকার ছেলেরা তত কঠোর হতে পারবে না। তাই একটু থাকবার জায়গা ও একমুঠো অন্নের বন্দোবস্ত করা—মোটা ভাত মোটা কাপড় পেলে ছেলেগুলো সাধনভজনে মন দেবে ও জীবহিতকল্পে জীবনপাত করতে শিখবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *