আধিচেতনা

একদিন স্বামীজী কেষ্টাকে বলিলেন, “ওরে, তোরা আমাদের এখানে খাবি?” কেষ্টা বলিল, “আমরা যে তোদের ছোঁয়া এখন আর খাই না; এখন যে বিয়ে হয়েছে, তোদের ছোয়া নুন খেলে জাত যাবেরে বাপ।” স্বামীজী বলিলেন, “নুন কেন খাবি? নুন না দিয়ে তরকারি রেঁধে দেবে। তাহলে তো খাবি?”
গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ সাঁওতালদের মধ্যে একজনের নাম ছিল ‘কেষ্টা’। স্বামীজী কেষ্টাকে বড় ভালবাসিতেন। কথা কহিতে আসিলে কেষ্টা কখনো কখনো স্বামীজীকে বলিত, “ওরে স্বামী বাপ, তুই আমাদের কাজের বেলা এখানকে আসিস না— তোর সঙ্গে কথা বললে আমাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়; পরে বুড়োবাবা এসে বকে।” কথা শুনিয়া স্বামীজীর চোখ ছলছল করিত এবং বলিতেন, “না না, বুড়োবাবা (স্বামী অদ্বৈতানন্দ) বকবে না; তুই তোদের দেশের দুটো কথা বল।” ইহা বলিয়া তাহাদের সাংসারিক সুখদুঃখের কথা পাড়িতেন।

একদিন স্বামীজী কেষ্টাকে বলিলেন, “ওরে, তোরা আমাদের এখানে খাবি?” কেষ্টা বলিল, “আমরা যে তোদের ছোঁয়া এখন আর খাই না; এখন যে বিয়ে হয়েছে, তোদের ছোয়া নুন খেলে জাত যাবেরে বাপ।” স্বামীজী বলিলেন, “নুন কেন খাবি? নুন না দিয়ে তরকারি রেঁধে দেবে। তাহলে তো খাবি?” কেষ্টা ঐ কথায় স্বীকৃত হইল। অনন্তর স্বামীজীর আদেশে মঠে সেই সকল সাঁওতালদের জন্য লুচি, তরকারি, মেঠাই, মণ্ডা, দধি ইত্যাদি যোগাড় করা হইল এবং তিনি তাহাদের বসাইয়া খাওয়াইতে লাগিলেন। খাইতে খাইতে কেষ্টা বলিল, “হারে স্বামী বাপ, তোরা এমন জিনিসটা কোথায় পেলি ? হামরা এমনটা কখনো খাইনি।” স্বামীজী তাহাদের পরিতোষ করিয়া খাওয়াইয়া বলিলেন, “তোরা যে নারায়ণ—আজ আমার নারায়ণের ভোগ দেওয়া হলো।” স্বামীজী যে দরিদ্র-নারায়ণসেবার কথা বলিতেন, তাহা তিনি নিজে এইরূপে অনুষ্ঠান করিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন।

আহারান্তে সাঁওতালরা বিশ্রাম করিতে গেলে স্বামীজী শিষ্যকে বলিলেন, “এদের দেখলুম যেন সাক্ষাৎ নারায়ণ—এমন সরল চিত্ত, এমন অকপট অকৃত্রিম ভালবাসা, এমন আর দেখিনি !” অনন্তর মঠের সন্ন্যাসিবর্গকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন, “দেখ, এরা কেমন সরল! এদের কিছু দুঃখ দূর করতে পারবি ? নতুবা গেরুয়া পরে আর কি হলো ? ‘পরহিতায়’ সর্বস্ব-অর্পণ—এরই নাম যথার্থ সন্ন্যাস ।
এদের ভাল জিনিস কখনো কিছু ভোগ হয়নি। ইচ্ছা হয়—মঠ ফঠ সব বিক্রি করে দিই, এই সব গরিব দুঃখী দরিদ্র-নারায়ণদের বিলিয়ে দিই, আমরা তো গাছতলা সার করেইছি। আহা ! দেশের লোক খেতে পরতে পাচ্ছে না – আমরা কোন্ প্রাণে মুখে অন্ন তুলছি? ওদেশে যখন গিয়েছিলুম, মাকে কত বললুম, ‘মা! এখানে লোক ফুলের বিছানায় শুচ্ছে, চর্ব্য চুষ্য খাচ্ছে, কি না ভোগ করছে। আর আমাদের দেশের লোকগুলো না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে। মা! তাদের কোন উপায় হবে না?’ ওদেশে ধর্মপ্রচার করতে যাওয়ার আমার এই আর একটা উদ্দেশ্য ছিল যে এদেশের লোকের জন্য যদি অন্নসংস্থান করতে পারি।

“দেশের লোকে দুবেলা দুমুঠো খেতে পায় না দেখে এক এক সময় মনে হয়—ফেলে দিই তোর শাঁখবাজান, ঘণ্টানাড়া; ফেলে দিই তোর লেখাপড়া ও নিজে মুক্ত হবার চেষ্টা; সকলে মিলে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে চরিত্র ও সাধনাবলে বড়লোকদের বুঝিয়ে কড়িপাতি যোগাড় করে নিয়ে আসি ও দরিদ্র-নারায়ণদের সেবা করে জীবনটা কাটিয়ে দিই।”

“আহা, দেশে গরিবদুঃখীর জন্য কেউ ভাবে না রে। যারা জাতির মেরুদণ্ড— যাদের পরিশ্রমে অন্ন জন্মাচ্ছে—যে মেথর মুদ্দাফরাশ একদিন কাজ বন্ধ করলে শহরে হাহাকার রব উঠে, হায়। তাদের সহানুভূতি করে, তাদের সুখে দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, দেশে এমন কেউ নাই রে! এই দেখ না—হিন্দুদের সহানুভূতি না পেয়ে মাদ্রাজ অঞ্চলে হাজার হাজার পেরিয়া কৃশ্চিয়ান হয়ে যাচ্ছে। মনে করিসনি কেবল পেটের দায়ে কৃশ্চিয়ান হয়। আমাদের সহানুভূতি পায় না বলে। আমরা দিনরাত কেবল তাদের বলছি—‘চুঁসনে’। দেশে কি আর দয়াধর্ম আছেরে বাপ! কেবল ছুঁৎমার্গীর দল! অমন আচারের মুখে মার ঝাঁটা—মার লাথি! ইচ্ছা হয় – তোর ছুঁৎমার্গের গণ্ডি ভেঙে ফেলে এখনি যাই—‘কে কোথায় পতিত কাঙাল দীনদরিদ্র আছিস‘বলে তাদের সকলকে ঠাকুরের নামে ডেকে নিয়ে আসি। এরা না উঠলে মা জাগবেন না। আমরা এদের অন্নবস্ত্রের সুবিধা যদি না করতে পারলুম, তবে আর কি হলো? হায়! এরা দুনিয়াদারি কিছু জানে না, তাই দিনরাত খেটেও অশন-বসনের সংস্থান করতে পারছে না। দে, সকলে মিলে এদের চোখ খুলে—আমি দিব্য চোখে দেখছি এদের ও আমার ভেতর একই ব্রহ্ম—একই শক্তি রয়েছেন, কেবল বিকাশের তারতম্য মাত্র। সর্বাঙ্গে রক্তসঞ্চার না হলে কোন দেশ কোন কালে কোথাও উঠেছে দেখেছিস ? একটা অঙ্গ পড়ে গেলে অন্য অঙ্গ সবল থাকলেও ঐ দেহ নিয়ে কোন বড় কাজ আর হবে না—এ নিশ্চিত জানবি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *