আধিচেতনা

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য বলিল, …“কিন্তু মহাশয়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বড়ই শব্দাড়ম্বরপ্রিয় ছিলেন বলিয়া বোধ হয়।”
স্বামীজী । …..তোদের দেশে কেউ একটা কিছু নতুন করলেই তোরা তাকে তাড়া করিস। আগে ভাল করে দেখ লোকটা কি বলছে, তা না—যাই কিছু আগেকার মতো না হলো অমনি দেশের লোকে তার পিছু লাগল।

এই ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ —যা তোদের বাঙলা ভাষার মুকুটমণি—তাকে অপদস্থ করতে কিনা ‘ছুঁচোবধকাব্য’ লেখা হলো! তা যত পারিস লেখ না, তাতে কি ? সেই ‘মেঘনাদবধকাব্য” এখনো হিমাচলের ন্যায় অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার খুঁত ধরতেই যারা ব্যস্ত ছিলেন, সেই critic-দের (সমালোচকদিগের) মত ও লেখাগুলো কোথায় ভেসে গেছে ! মাইকেল নতুন ছন্দে, ওজস্বিনী ভাষায় যে কাব্য লিখে গেছেন—তা সাধারণে কি বুঝবে ? এই যে জি সি > কেমন নতুন ছন্দে কত চমৎকার চমৎকার বই আজকাল লিখছে, তা নিয়েও তোদের অতিবুদ্ধি পণ্ডিতগণ কত criticise (সমালোচনা) কচ্ছে—দোষ ধরছে! জি সি কি তাতে ভূক্ষেপ করে ? পরে লোকে ঐসকল পুস্তক appreciate (আদর) করবে।

এইরূপে মাইকেলের কথা হইতে তিনি বলিলেন, “যা, নিচে লাইব্রেরী থেকে মেঘনাদবধকাব্যখানা নিয়ে আয়।” শিষ্য মঠের লাইব্রেরী থেকে মেঘনাদবধকাব্য লইয়া আসিলে বলিলেন, “পড় দিকি—কেমন পড়তে জানিস ?”
শিষ্য বই খুলিয়া প্রথম সর্গের খানিকটা সাধ্যমত পড়িতে লাগিল। কিন্তু পড়া স্বামীজীর মনোমত না হওয়ায় তিনি ঐ অংশটি পড়িয়া দেখাইয়া শিষ্যকে পুনরায় উহা পড়িতে বলিলেন। শিষ্য এবার অনেকটা কৃতকার্য হইল দেখিয়া প্রসন্নমুখে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বল দিকি—এই কাব্যের কোন্ অংশটি সর্বোৎকৃষ্ট ?”

শিষ্য কিছুই না বলিতে পারিয়া নির্বাক হইয়া রহিয়াছে দেখিয়া স্বামীজী বলিলেন, “যেখানে ইন্দ্ৰজিৎ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, মন্দোদরী শোকে মুহ্যমানা হয়ে রাবণকে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করছে, কিন্তু রাবণ পুত্রশোক মন থেকে জোর করে ঠেলে ফেলে মহাবীরের ন্যায় যুদ্ধে কৃতসঙ্কল্প—প্রতিহিংসা ও ক্রোধানলে স্ত্রী-পুত্র সব ভুলে যুদ্ধের জন্য বহির্গমনোন্মুখ—সেই স্থান হচ্ছে কাব্যের শ্রেষ্ঠ কল্পনা। ‘যা হবার হোক গে ; আমার কর্তব্য আমি ভুলব না, এতে দুনিয়া থাক, আর যাক’—এই হচ্ছে মহাবীরের বাক্য। মাইকেল সেইভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে কাব্যের ঐ অংশ লিখেছিলেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *