অধিচেতনা

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউ এ পি ডিজিটাল ডেস্কঃ তোমরা শনিয়া আশ্চর্য হইবে, কিন্তু, সত্য কথা বলিতে কি, আমাদের অপেক্ষা মার্কিনেরা বেদান্তকে অধিক পরিমাণে কর্মজীবনে পরিণত করিয়াছে। আমি নিউ ইয়র্কের সমদ্রতটে দাঁড়াইয়া দেখিতাম—বিভিন্ন দেশ হইতে লোক আমেরিকায় বাস করিবার জন আসিতেছে । দেখিলে বোধ হইত যেন তাহারা মরমে মরিয়া আছে – পদদলিত, আশাহীন। কেবল একটি কাপড়ের পাটলি তাহাদের সম্বল — কাপড়গুলিও সব ছিন্নভিন্ন, তাহারা ভয়ে লোকের মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিতে অক্ষম। একটা পালিশের লোক দেখিলেই ভয় পাইয়া ফুটপাতের অন্যদিকে যাইবার চেষ্টা করে। এখন দেখ,

ছয়মাস বাদে সেই লোকগুলিই ভাল জামাকাপড় পরিয়া সোজা হইয়া চলিতেছে— সকলের দিকেই নির্ভীক দৃষ্টিতে চাহিতেছে । এমন অদ্ভুত পরিবর্তন কিভাবে আসিল? মনে কর, সে-ব্যক্তি আর্মেনিয়া বা অন্য কোন স্থান হইতে আসিতেছে—সেখানে কেহ তাহাকে গ্রাহ্য করিত না, সকলেই পিষিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিত, সেখানে সকলেই তাহাকে বলিত——তুই জন্মেছিস গোলাম, থাকবি গোলাম, একট, যদি নড়তে চড়তে চেষ্টা করিস তো তোকে পিষে ফেলব।’ চারিদিকের সবই যেন তাহাকে বলিত, ‘গোলাম তাই, গোলাম আছিস— যা আছিস, তাই থাক্। জন্মেছিলি যখন, তখন যে-নৈরাশ্যের অন্ধকারে জন্মেছিলি, সেই নৈরাশ্যের অন্ধকারে সারাজীবন পড়ে থাক্।’ সেখানকার হাওয়া যেন তাহাকে গনগনে করিয়া বলিত, ‘তোর কোন আশা নেই— গোলাম হয়ে চিরজীবন নৈরাশ্যের অন্ধকারে পড়ে থাক ।” সেখানে বলবান ব্যক্তি তাহাকে পিষিয়া তাহার প্রাণ হরণ করিয়া লইতেছিল । আর যখনই সে জাহাজ হইতে নামিয়া নিউ ইয়র্কের রাস্তায় চলিতে লাগিল, সে দেখিল—একজন ভালপোশাক পরা ভদ্রলোক তাহার করমর্দন করিল। সে বে ছিন্নবস্ত্রপরিহিত, আর ভদ্রলোকটি যে উত্তমবস্ত্রধারী, তাহাতে কিছু আসে যার না। আর একট, অগ্রসর হইয়া সে এক ভোজনাগারে গিয়া দেখিল, ভদ্রলোকেরা যে টেবিলে বসিয়া আহার করিতেছেন—সেই টেবিলেরই এক প্রান্তে তাহাকে বসিতে বলা হইল। সে চারিদিকে ঘুরিতে লাগিল, দেখিল – এ এক নতন জীবন; সে দেখিল—এমন জায়গাও আছে, যেখানে আর পাঁচজন মানষের ভিতরে সেও একজন মানুষ। হয়তো সে ওয়াশিংটনে গিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সহিত করমর্দন করিয়া আসিল, সেখানে হয়তো সে দেখিল—দূরবর্তী পল্লীগ্রাম হইতে মলিনবস্ত্র-পরিহিত কৃষকেরা আসিয়া সকলেই প্রেসিডেন্টের করমর্দন করিতেছে। তখন তাহার মায়ার আবরণ খসিয়া গেল । সে যে ব্রহ্ম—মায়াবশে এইরূপে দূর্বল দাসভাবাপন্ন হইয়াছিল । এখন সে আবার জাগিয়া উঠিয়া দেখিল—মনষ্যপর্ণ জগতে সেও একজন মানষ

আমাদের এই দেশে—বেদান্তের এই জন্মভূমিতে সাধারণ লোককে বহু শতাব্দী যাবৎ এইরূপে মায়াচক্রে ফেলিয়া এমন হীনভাবাপন্ন করিয়া ফেলা হইয়াছে। তাহাদের স্পর্শে অশ,চি, তাহাদের সঙ্গে বসিলে অশুচি । তাহাদিগকে বলা হইতেছে, নৈরাশ্যের অন্ধকারে তোদের জন্ম—থাক্, চিরকাল এই নৈরাশ্যের অন্ধকারে।’ ফল এই হইয়াছে যে, সাধারণ লোক ক্রমশঃ ডুবিতেছে, গভীর হইতে গভীরতর অন্ধকারে ডুবিতেছে, মননুষ্যজাতি যতদূরে নিকৃষ্ট অবস্থায় পৌঁছিতে পারে, অবশেষে ততদরে পৌছিয়াছে। কারণ এমন দেশ আর কোথায় আছে, যেখানে মানষকে গো-মহিষাদির সঙ্গে একত্র বাস করিতে হয়? আর ইহার জন্য অপর কাহারও ঘাড়ে দোষ চাপাইও না—অজ্ঞ ব্যক্তিরা যে ভুল করিয়া থাকে, তোমরা সেই ভ্রমে পড়িও না। ফলও হাতে হাতে দেখিতেছ, তাহার কারণও এইখানেই বর্তমান। বাস্তবিক দোষ আমাদেরই। সাহস করিয়া দাঁড়াও, নিজেদের ঘাড়েই সব দোষ লও। অন্যের স্কন্ধে দোষারোপ করিতে যাইও না, তোমরা যে-সকল কষ্ট ভোগ করিতেছ, সেগুলির জন্য তোমরাই দায়ী।…

এখানে সেই হৃদয় কোথায়, যাহাকে ভিত্তি করিয়া এই জাতির উন্নতি প্রতিষ্ঠিত হইবে? আমরা পাঁচজনে মিলিয়া একটি ছোট- খাটো যৌথ-কারবার খুলিলাম, কিছুদিন চলিতে না চলিতে আমরা পরস্পরকে ঠকাইতে লাগিলাম, শেষে সব ভাঙিয়া চুরমার হইয়া গেল। তোমরা ইংরেজদের অনুকরণ করিবে বলো, আর তাহাদের মতো শক্তিশালী জাতি গঠন করিতে চাও, কিন্তু, তোমাদের ভিত্তি কোথায়? আমাদের বালির ভিত্তি, তাহার উপর নির্মিত গৃহ অতি শীঘ্রই চরমার হইয়া ভাঙিয়া যায় ৷….ওঠ, জাগো; এই ক্ষুদ্র জীবন যদি যায়, ক্ষতি কি? সকলেই মরিবে — সাধ, অসাধ,, ধনী-দরিদ্র— সকলেই মরিবে। শরীর কাহারও চিরকাল থাকিবে না । অতএব ওঠ, জাগো এবং সম্পূর্ণ অকপট হও। ভারতে ঘোর কপটতা প্রবেশ করিয়াছে। চাই চরিত্র, চাই এইরূপ দৃঢ়তা ও চরিত্রবল, যাহাতে মান, একটা ভাবকে মরণকামড়ে ধরিয়া থাকিতে পারে।….ঈশ্বর ও শয়তানের সেবা কখনও এক সঙ্গে করিতে পার না। বৈরাগ্যবান হও তোমাদের পূর্বপুরুষগণ বড় বড় কাজ করিবার জন্য সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন। বর্তমানকালে এমন অনেকে আছেন, যাঁহারা নিজ নিজ মক্তির জন্য সংসার ত্যাগ করিয়া- ছেন।

তোমরা সব ছাড়িয়া ফেলিয়া দাও, এমন কি নিজেদের মক্তি পর্যন্ত দরে ফেলিয়া দাও ; যাও, অন্যের সাহায্য কর । তোমরা সর্বদাই বড় বড় কথা বলিতেছ, কিন্তু, তোমাদের সম্মুখে এই কর্ম পরিণত বেদান্ত স্থাপন করিলাম। তোমাদের এই ক্ষুদ্র জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হও। যদি এই জাতি জীবিত থাকে, তবে তুমি আমি— আমাদের মতো হাজার হাজার লোক যদি অনাহারে মরে, তাহাতেই বা ক্ষতি কি?….অতএব ওঠ, জাগো — পৃথিবীর আধ্যাত্মিকতা রক্ষা করিবার জন্য বাহ – প্রসারিত কর। আর প্রথমে তোমাদের স্বদেশের কল্যাণের জন্য এই তত্ত্ব কার্যে পরিণত কর। ব্যবহারিক জগতে অদ্বৈতবাদ একট, কাজে পরিণত করা আমাদের যত প্রয়োজন, আধ্যাত্মিক জগতে ততটা প্রয়োজন নয়; প্রথমে অন্নের ব্যবস্থা করিতে হইবে, তারপর ধর্ম । গরিব লোকেরা অনশনে মরিতেছে, আমরা তাহাদিগকে অতিরিক্ত ধর্মোপদেশ দিতেছি ! মত-মতান্তরে তো আর পেট ভরে না। আমাদের একটি দোষ বড়ই প্রবল – প্রথমতঃ আমাদের দুর্বলতা, দ্বিতীয়তঃ ঘৃণা— হৃদয়ের শঙ্কতা। লক্ষ লক্ষ মতবাদের কথা বলিতে পারো, কোটি কোটি সম্প্রদায় গঠন করিতে পারো, কিন্তু, যতদিন না তাহাদের দঃখ প্রাণে প্রাণে অননুভব করিতেছ, বেদের উপদেশ অনুযায়ী যতদিন না জানিতেছ যে, তাহারা তোমার শরীরের অংশ, যতদিন না তোমরা ও তাহারা, ধনী-দরিদ্র, সাধ, অসাধ, সকলেই সেই অনন্ত অখণ্ডরূপে— যাঁহাকে তোমরা ব্রহ্ম বলো, তাঁহার অংশ হইয়া যাইতেছ, ততদিন কিছুই হইবে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *