গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য।…স্বামীজী, বর্তমানকালে আমাদের সমাজ ও দেশের এত দুর্দশা হইয়াছে কেন ?
স্বামীজী। তোরাই সে জন্য দায়ী। শিষ্য। বলেন কি ? কেমন করিয়া ?
স্বামীজী। বহুকাল থেকে দেশের নীচ জাতদের ঘেন্না করে করে তোরা এখন জগতে ঘৃণাভাজন হয়ে পড়েছিস!
শিষ্য। কবে আবার আমরা উহাদের ঘৃণা করিলাম ?
স্বামীজী। কেন ? ভট্চাযের দল তোরাই তো বেদবেদান্তাদি যত সারবান শাস্ত্রগুলি ব্রাহ্মণেতর জাতদের কখনো পড়তে দিসনি-তাদের ছুঁসনি—তাদের কেবল নিচে দাবিয়ে রেখেছিস—স্বার্থপরতা থেকে তোরাই তো চিরকাল ঐরূপ করে আসছিস। ব্রাহ্মণেরাই তো ধর্মশাস্ত্রগুলিকে একচেটে করে বিধি-নিষেধ তাদেরই হাতে রেখেছিল ; আর ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতগুলিকে নীচ বলে বলে তাদের মনে ধারণা করিয়ে দিয়েছিল যে, তারা সত্য সত্যই হীন। তুই যদি একটা লোককে খেতে শুতে বসতে সর্বক্ষণ বলিস——তুই নীচ’, ‘তুই নীচ’, তবে সময়ে তার ধারণা হবেই হবে যে, “আমি সত্য সত্যই নীচ”। ইংরেজীতে একে বলে hypnotise (হিপনোটাইজ) বা মন্ত্রমুগ্ধ করা। ব্রাহ্মণেতর জাতগুলির একটু একটু করে চমক ভাঙছে। ব্রাহ্মণদের তন্ত্রেমন্ত্রে তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে পদ্মার পাড় ধসে যাবার মতো ব্রাহ্মণদের সব তুকতাক এখন ভেঙে পড়ছে দেখতে পাচ্ছিস তো ?
শিষ্য। আজ্ঞা হাঁ, আচার-বিচারটা আজকাল ক্রমেই শিথিল হইয়া পড়িতেছে।
স্বামীজী। পড়বে না ? ব্রাহ্মণেরা যে ক্রমে ঘোর অনাচার-অত্যাচার আরম্ভ করেছিল ; স্বার্থপর হয়ে কেবল নিজেদের প্রভুত্ব বজায় রাখবার জন্য কত কি অদ্ভুত অবৈদিক, অনৈতিক, অযৌক্তিক মত চালিয়েছিল ! তার ফলও হাতে হাতেই পাচ্ছে।
শিষ্য। কি ফল পাইতেছে, মহাশয় ? স্বামীজী। ফলটা কি দেখতে পাচ্ছিস না ? তোরা যে ভারতের অপর সাধারণ জাতগুলিকে ঘেন্না করেছিলি, তার জন্যই এখন তোদের হাজার বৎসরের দাসত্ব করতে হচ্ছে—তাই তোরা এখন বিদেশীর ঘৃণাস্থল ও স্বদেশবাসিগণের উপেক্ষাস্থল হয়ে রয়েছিস!
শিষ্য। কিন্তু মহাশয়, এখনো তো ব্যবস্থাদি ব্রাহ্মণদের মতেই চলিতেছে গর্ভাধান হইতে যাবতীয় ক্রিয়াকলাপেই লোকে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ বলিতেছেন সেইরূপই করিতেছে। তবে আপনি ঐরূপ বলিতেছেন কেন ?
স্বামীজী। কোথায় চলছে ? শাস্ত্রোক্ত দশবিধ সংস্কার কোথায় চলছে ? আমি তো ভারতবর্ষটা সব ঘুরে দেখেছি, সর্বত্রই শ্রুতি-স্মৃতি-বিগর্হিত দেশাচারে সমাজ শাসিত হচ্ছে ! লোকাচার, দেশাচার ও স্ত্রী-আচার এই এখন সর্বত্র স্মৃতিশাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে ! কে কার কথা শুনছে ? টাকা দিতে পারলেই ভট্চাযের দল যা তা বিধি-নিষেধ লিখে দিতে রাজি আছেন ! কয়জন ভট্ট্চায বৈদিক কল্প, গৃহ্য ও শ্রৌত সূত্র পড়ছেন? তারপর দেখ বাংলায় রঘুনন্দনের শাসন, আর একটু এগিয়ে দেখবি মিতাক্ষরার শাসন, আর একদিকে গিয়ে দেখ মনুস্মৃতির শাসন চলেছে! তোরা ভাবিস—সর্বত্র বুঝি একমত চলেছে! সেইজন্যই আমি চাই—বেদের প্রতি লোকের সম্মান বাড়িয়ে বেদের চর্চা করাতে ও সর্বত্র বেদের শাসন চালাতে
শিষ্য। কিন্তু মহাশয়, মনু, যাজ্ঞবল্ক্য প্রভৃতি ঋষিগণ দেশে পুনরায় না জন্মালে উহা সম্ভবপর মনে হয় না ।
স্বামীজী। আরে, পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থ চেষ্টার জন্যই তো তাঁরা মনু, যাজ্ঞবল্ক্য হয়েছিলেন, না আর কিছু ! চেষ্টা করলে আমরাই যে মনু, যাজ্ঞবন্ধ্যের চেয়ে ঢের বড় হতে পারি । আমাদের মতই বা তখন চলবে না কেন ?
