কুণালের ক্ষেত্রে তা খাটল না

কিন্তু বার করে দিলে সে বাইরে থেকে তাঁবুর ভিতরে প্রস্রাব করবে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘লিন্ডনপন্থা’ ধরে রাখতে পারল না তৃণমূল। সুভাষের ক্ষেত্রে বসুর ‘কৌশল’ কাজে লেগেছিল। কিন্তু কুণালের ক্ষেত্রে তা খাটল না

নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ- পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই নীতি প্রয়োগ করেছিলেন জ্যোতি বসু। দলের অনুশাসন এবং পার্টি লাইনের বাইরে গিয়ে বিবিধ কাজ কারবারের দায়ে সুভাষ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যখন বার বার দলের অন্দরে দাবি উঠছে, তখন বসুও ‘লিন্ডনপন্থা’ নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সুভাষ দলের বাইরে গেলে দলের পক্ষে ‘বিপজ্জনক’ হবেন। তখন তিনি বাইরে থেকে তাঁবুর ভিতরে জলবিয়োগ করে দিতে পারেন! কিন্তু দলের অন্দরে রেখে তাঁকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা যাবে। কুণাল ঘোষ সম্পর্কেও সেই একই পন্থা নিয়েছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে মুখ খোলার জন্য অতীতে তাঁকে এক বার ‘সেন্সর’ করেছিল দল। পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে সে বার যে তিনি একটু ‘বেশি’ই বলে ফেলেছিলেন, তা মেনে নেন কুণাল নিজেও।

কিন্তু তার পরেও তিনি মুখপাত্রের ভুমিকায় ফিরে এসেছিলেন। সেটা কয়েক বছর আগের ঘটনা। তার পরেও সম্প্রতি তৃমমূলের লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আক্রমণ করেছেন কুণাল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর উপরে রুষ্ট হয়েছেন। কিন্তু একটা পর্যায়ের পরে কঠোর হতে পারেননি। আসলে হতে চাননি। কারণ, তৃণমূলের শাখা-প্রশাখা এ কথা জানে যে, কুণাল দলের ভিতরের চেয়ে বাইরে বেশি ‘বিপজ্জনক’ হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। দ্বিতীয়ত, তাঁকে দিয়ে এমন রাজনৈতিক (কখনও-সখনও ব্যক্তিগত) আক্রমণ করানো যায়, যা অন্য অনেককে দিয়ে করানো যায় না। দ্বিতীয়ত, কুণাল নিজে দীর্ঘ দিনের সাংবাদিক হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের চাহিদা বোঝেন। প্রায় সমস্ত সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর পেশাদারি তো বটেই, ব্যক্তিগত পর্যায়েও সখ্য রয়েছে। রাতবিরেতে তাঁর কাছে প্রতিক্রিয়া চাইলেও পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, কুণাল এমন সমস্ত বিষয়ে দলকে ‘রক্ষা’ করতে মাঠে নেমে পড়তে পারেন, যা অন্য অনেকের কাছে অকল্পনীয়।

মন্ত্রী তথা তৃণমূলের মুখপাত্র শশী পাঁজা তো একটি অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেছিলেন, ‘‘কুণালদাকে দেখি আর ভাবি, কত সহজে কত কথা বলে দিতে পারেন!’’ সত্যিই তাই! কুণাল যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেছেন, তা কার্যত অভাবনীয়। সেই কারণেই তাঁর ‘উপযোগিতা’ নিয়ে কোনও সন্দেহ তৃণমূলের অন্দরে ছিল না। সেই কারণেই তাঁর বিবিধ ‘বিচ্যুতি’কে খানিকটা ‘লঘু’ করেই দেখেছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে কখনও- সখনও। কিন্তু তার পরে আবার তা মেরামতও করে নিয়েছে উভয় পক্ষ। কুণালের হিতৈষীরা বলেছেন, ‘‘দলের কুণাল ঘোষকে প্রয়োজন। যেমন কুণালেরও দরকার দলকে। উভয়েই উভয়ের এই অবস্থানটা বোঝে।’’ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই প্রকাশ্যে কথা বলছিলেন কুণাল। যদিও সুদীপ সে বিষয়ে একটিও পাল্টা মন্তব্য করেননি।

বস্তুত, বুধবারেও সুদীপের সঙ্গে তাঁর এক অনুগামীর কুণালকে নিয়ে যে হোয়াট্‌সঅ্যাপ কথোপকথন ফাঁস হয়েছে, সেখানেও সুদীপ বিষয়টিকে ‘অবজ্ঞা’ করতেই বলেছেন। যা নিয়ে লোকসভায় সুদীপের এক সতীর্থ বলছিলেন, ‘‘এই হল বড় রাজনীতিক! প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যা করণীয় করবেন।’’ সুদীপ সত্যিই ‘ভিতরে ভিতরে’ কিছু করেছেন কি না, তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু গোটা তৃণমূল দেখেছে, কুণালকে বিবৃতি জারি করে তাঁর দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তার পর থেকে কুণাল যা শুরু করেছেন, তা সদর দফতরে কামান দাগার শামিল! যে বক্তব্য সম্পর্কে ঘরোয়া আলোচনায় তৃণমূলের অনেক নেতাই মনে করছেন পরিস্থিতি আরও ঘোরাল হতে পারে।

এক নেতার কথায়, ‘‘হাটের মাঝে অনেক হাঁড়ি রাখা রয়েছে। এত দিন কুণালকে হাঁড়ি পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ বার ওর হাতে খেটো বাঁশ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ও তো হাঁড়ি ভাঙবেই!’’আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এক সরকারি কর্তা প্রশ্ন করেছিলেন, এফবিআইয়ের বড়কর্তাকে কেন সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না? জবাবে জনসন বলেছিলেন, ‘‘বেটার টু হ্যাভ ইয়োর এনিমিজ় ইনসাইড দ্য টেন্ট পিসিং আউট দ্যান আউটসাইড দ্য টেন্ট পিসিং ইন!’’ অর্থাৎ, শত্রুকে তাঁবুর ভিতরে রাখা ভাল। তা হলে সে ভিতর থেকে তাঁবুর বাইরে প্রস্রাব করবে। কিন্তু বার করে দিলে সে বাইরে থেকে তাঁবুর ভিতরে প্রস্রাব করবে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘লিন্ডনপন্থা’ ধরে রাখতে পারল না তৃণমূল। সুভাষের ক্ষেত্রে বসুর ‘কৌশল’ কাজে লেগেছিল। কিন্তু কুণালের ক্ষেত্রে তা খাটল না বলেই এখনও পর্যন্ত মনে করছেন তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের একটা বড় অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *