পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে তীব্র তৎপরতা

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক

বাদ ৬৩ লক্ষের বেশি নাম! এখনও ‘বিবেচনাধীন’ ২০ লক্ষ ভোটার

৩০শে  মার্চ,২০২৬ :- নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্ক:
পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা ঘিরে নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই চলছে, যার জেরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা ও বিতর্ক।কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, **প্রায় ৬০ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের মধ্যে রবিবার রাত পর্যন্ত ৪২ লক্ষের তথ্য নিষ্পত্তি করা হয়েছে**। এই নিষ্পত্তির ভিত্তিতে **প্রায় ১৮ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে**। তবে এখনও প্রায় **২০ লক্ষ ভোটারের নাম বিবেচনাধীন অবস্থায় রয়েছে**, যা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাজ চলছে।

নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, **৬ এপ্রিল, প্রথম দফার ভোটের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগেই এই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা হবে**।

📋 **অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ, বাদ পড়ার হার নিয়ে ধোঁয়াশা**

এরই মধ্যে কমিশন প্রকাশ করেছে **চতুর্থ অতিরিক্ত ভোটার তালিকা**, যেখানে প্রায় **২ লক্ষ ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে**। তবে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকা থেকে ঠিক কত জনের নাম বাদ পড়েছে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি কমিশন।

যদিও কমিশন সূত্রে দাবি, এই তালিকায় থাকা **৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে** বলে প্রাথমিক অনুমান।

সব মিলিয়ে, খসড়া তালিকা ও চূড়ান্ত তালিকা ধরে ইতিমধ্যেই **৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে**, যা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

⚖️ **সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তথ্য যাচাই**

এই বিশাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে **সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৭০৫ জন বিচারককে নিয়োগ করা হয়েছে**, যারা ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের নথি যাচাইয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রয়োজনে ভিনরাজ্য থেকেও বিচারক আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, এই যাচাই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ইতিমধ্যেই ২৩ মার্চ প্রথম অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, এবং তার পরবর্তী ধাপ হিসেবে চতুর্থ তালিকাও সামনে এসেছে।

📊 **পুরো প্রক্রিয়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ**

সংখ্যার নিরিখে গোটা প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিস্তৃত—

* এসআইআর শুরুর আগে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল: **৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯**
* খসড়া তালিকায় বাদ পড়ে: **৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন**
* খসড়া তালিকায় অবশিষ্ট ভোটার: **৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ জন**
* ২৮ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় আরও বাদ: **৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জন**
* মোট বাদ (২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত): **৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন**

খসড়া তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে প্রায় **১ কোটি ৫২ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য চিহ্নিত করা হয়**।

এর মধ্যে—

* **৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৬ জন ‘নো-ম্যাপিং’ ভোটার**, যারা ২০০২ সালের শেষ এসআইআরের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ দেখাতে পারেননি
* বাকি **১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটার ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’** বা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে চিহ্নিত হন

সব মিলিয়ে প্রায় **১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের শুনানি সম্পন্ন হয়**। এর মধ্যে **৮২ লক্ষ ভোটারের নথি গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেয় কমিশন**, এবং বাকি ক্ষেত্রে বাছাই করে নাম বাদ দেওয়া হয়।

 🚨 **প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় বদলি**

ভোটের আগে প্রশাসনিক স্তরেও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
**রাজ্যের একাধিক আমলা ও পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে**, এবং সেই জায়গায় নতুন নিয়োগ করা হয়েছে।

কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—
👉 যাঁদের সরানো হয়েছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচনী কাজে আপাতত আর কোনওভাবেই নিয়োগ করা যাবে না।

এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

 🏛️ **তৃণমূলের তোপ, মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি**

নির্বাচন কমিশনের এই সক্রিয়তা নিয়ে সরব হয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস।
মুখ্যমন্ত্রী **মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়** মুখ্য নির্বাচন কমিশনার **জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন**।

চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন—

* রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও পূর্ব আলোচনা ছাড়াই আধিকারিকদের বদলি করা হচ্ছে
* প্রচলিত নিয়ম ভেঙে সরাসরি নিয়োগ করা হচ্ছে
* আগে সাধারণত তিনজনের প্যানেল চাওয়া হত, এবার সেই প্রক্রিয়া মানা হয়নি

মুখ্যমন্ত্রী এই পদক্ষেপকে **গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী** বলেও উল্লেখ করেন এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও এই ইস্যুতে নিশানা করেন।

 

 🔍 **রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে**

ভোটের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন, বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া, এবং প্রশাসনিক বদলি—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ভোটের ফলাফল এবং রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।