পরিসংখ্যান বলছে, ধূপগুড়ি বিধানসভার ২৬০ টি বুথে মোট ভোট পড়েছে ৭৮.১৯ শতাংশ। ভোটের হারের বিচারে তা ২০১৬ এবং ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় অনেকটাই কম। ২০১৬ ভোট পড়েছিল ৮৮ শতাংশ। আবার ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ।গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছিল। ৪৩৫৫ ভোটে জয় পায় বিজেপি।
নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ পোস্টাল ব্যালট পেপারের কাউন্টিংয়ে এগিয়ে ছিল বিজেপি। আর সেই জয়ের আভাস পেয়েই ক্যাম্পের বাইরে শুরু হয়ে গিয়েছিল মাংস-ভাত রান্না। কিন্তু তখনই তৃণমূল নেতা গৌতম দেব অবশ্য স্পষ্ট বলেছিলেন, বানারহাটে তারা কিছুটা দুর্বল। গণনা বানারহাট ছাড়িয়ে অন্যত্র গড়াতেই হিসাব মিলতে শুরু করল। ছবি বদলে গেল গণনার চতুর্থ রাউন্ডের পর থেকেই। এর পরের প্রত্যেকটা রাউন্ডই যেন নাটকীয়তায় ভরপুর। প্রত্যেকটি রাউন্ডের শেষেই একজন করে প্রার্থী এগিয়ে যাচ্ছেন তো পরের রাউন্ডে অপর জন টেক্কা দিচ্ছেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলতে লাগল তৃণমূল-বিজেপির। তবে পঞ্চম রাউন্ডেই ক্লাইম্যাক্স! এরপর থেকে আর পিছতে হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে।
নিয়ম মাফিক দশম রাউন্ড গণনার শেষে শেষ হাসি হাসল তৃণমূলই।পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর এবং লোকসভা নির্বাচনের আগে এই একটা উপনির্বাচনই কার্যত শাসক-বিজেপি উভয়ের কাছেই অগ্নিপরীক্ষার সামিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দু’পক্ষরই বড় বড় নেতারা প্রচারে এসেছিলেন। তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়ে পড়ে থেকেছেন ধূপগুড়িতে। তেমনই মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ডঃ সুকান্ত মজুমদার। চা বলয় চষে বেরিয়েছিলেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও।
প্রেস্টিজ ফাইট বলে কথা! কিন্তু এরই মধ্যে বিরাট টুইস্ট- একদা তৃণমূল বিধায়ক মিতালি রায় অভিষেকের সভামঞ্চে থেকে নামার ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাতে তুলে নিলেন পদ্ম পতাকা। চমক তো বটেই, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথায়, এই দলবদল উপ নির্বাচনের আগে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় ফ্যাক্টর! আর তা যে বিজেপির বিরুদ্ধে গিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলাফল দেখে শুনে অনেকেই বলছেন, অনন্ত মহারাজ, মিতালি রায়ের যোগদান বিজেপিকে রাজবংশী ভোটের প্রশ্নে বাড়তি সুবিধা তো দিলই না বরং এক রকম ডুবিয়েই দিল।ধূপগুড়িতে উড়ল সবুজ আবির! উপ নির্বাচনে জয়ী হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নির্মলচন্দ্র রায়৷ ৪ হাজার ৩৪৪ ভোটে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী তাপসী রায়কে পরাজিত করলেন তিনি৷ রাজবংশী অধ্যুষিত উত্তরবঙ্গের এই বিধানসভা কেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত জয় পেয়ে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে খানিক স্বস্তি তৃণমূল শিবিরে৷
জয়ের পরে এই উপ নির্বাচনে তৃণমূলের অন্যতম কাণ্ডারী শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব বললেন, ‘‘আমরা প্রত্যয়ের সঙ্গে কাজ করেছি৷ দিন যত এগিয়েছে ততই আমাদের ভোট বেড়েছে৷ দলীয় নেতৃত্ব যে হিসাব কষেছিলেন, সেইরকমই ফলাফল হয়েছে৷ চব্বিশেও দার্জিলিঙের সব লোকসভা আসনে আমরাই জিতব৷’’ ধূপগুড়ির জয়ের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন অভিষেকেও৷দিনের শুরুটা অবশ্য ভালই ছিল বিজেপির৷ ব্যালট পেপারে হার হয়েছিল তৃণমূলের৷ তারপরে প্রথম এবং দ্বিতীয় রাউন্ডেও এগিয়ে ছিল পদ্মশিবির৷ কিন্তু, তৃতীয় রাউন্ডের শেষে মাত্র ১০১ ভোটে হলেও তাদের চেয়ে এগিয়ে যায় শাসকদল৷ তারপরে পঞ্চম রাউন্ডে এসে খানিকটা ফেরার চেষ্টা করলেও, সপ্তম রাউন্ডের গণনার শেষে স্পষ্ট হয়ে যায় গোটা ছবিটা৷ তৃণমূলের নির্মলচন্দ্র রায়ের পক্ষেই ‘রায়’ দেন ধূপগুড়ির মানুষ৷
এখানে লড়াইয়ে ছিলেন তিন দলের তিন রায়। কংগ্রেস সমর্থিত সিপিআইএম প্রার্থী ঈশ্বরচন্দ্র রায় স্থানীয় লোকশিল্পী এবং অবশ্যই রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি৷ একুশের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী মিতালি রায়কে টিকিট না দিয়ে স্থানীয় রাজবংশী অধ্যাপক নির্মলচন্দ্র রায়ের উপরেই ভরসা রেখেছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব৷ অন্যদিকে, পুলওয়ামা কাণ্ডে নিহত সেনার স্ত্রী তাপসী রায়কে প্রার্থী করেছিল বিজেপি৷ত্রিমুখী লড়াইয়ে প্রথম থেকেই রাজবংশী ভোটে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল প্রত্যেক রাজনৈতিক দলই৷ যদিও এদিন শুরু থেকেই লড়াইয়ে তেমন ভাবে নামতেই পারেননি জোট প্রার্থী ঈশ্বরচন্দ্র৷ পঞ্চম রাউন্ডের শেষেই কার্যত বিদায় নিতে হয় তাঁকে৷২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৪ হাজারের সামান্য বেশি এই আসনেই ভোটে জয়ী হয়েছিল সিপিআইএম। ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ভোটে জয়ী হয় তৃণমূল। ২০২১-এ বিজেপি জেতে ৪ হাজার ৩৫৫ ভোটে । ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে ধূপগুড়িতে জয়ী হন বিজেপির বিষ্ণুপদ রায়। হারিয়ে দেন তৃণমূলের মিতালি রায়কে। বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপদের মৃত্যুর কারণেই ধূপগুড়িতে উপনির্বাচন হয়।
তেইশের পঞ্চায়েত ভোটে ধূপগুড়িতে পদ্মকে টেক্কা দিয়েছিল ঘাসফুল। ধূপগুড়ি বিধানসভা এলাকায় পঞ্চায়েত সমিতি ধূপগুড়ি। এই পঞ্চায়েত সমিতিতে ২৭টি আসন। তেইশের পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূল ১৯ এবং বিজেপি ৮টিতে জয় পেয়েছিল।২০১৮-র লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই উত্তরবঙ্গে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে গেরুয়া শিবির৷ সংগঠনের নিরিখে উত্তরবঙ্গ বিজেপির অন্যতম জোরের জায়গা৷ কিন্তু, সেই কড়া ঠাঁই এবার ধীরে ধীরে ভাঙার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল৷ চব্বিশের নির্বাচনের আগে ধূপগুড়ির এই জয় যে সেই চেষ্টায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে, এমনটা বলাই যায়৷বিষ্ণুপদ রায়ের মৃত্যুর কারণেই এই উপনির্বাচন। পরিসংখ্যান বলছে, ধূপগুড়ি বিধানসভার ২৬০ টি বুথে মোট ভোট পড়েছে ৭৮.১৯ শতাংশ। ভোটের হারের বিচারে তা ২০১৬ এবং ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় অনেকটাই কম। ২০১৬ ভোট পড়েছিল ৮৮ শতাংশ। আবার ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ।
গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছিল। ৪৩৫৫ ভোটে জয় পায় বিজেপি। ১ লক্ষ ৩৩৩ ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। বিজেপি পেয়েছিল ১,০৪,৬৮৮ ভোট। কিন্তু উপনির্বাচনে আর সেই জয়ের ধারা ধরে রাখতে পারল না বিজেপি।বিজেপির পরিষদীয় দলের সূত্র বলছে, বানারহাটকে টার্গেট করেছিল বিজেপি। মনোজ টিগ্গাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সঙ্গে নেন নগরাকাটার বিধায়ক পুনা ভেংরাকে। দু’জনে মিলে চা বলয় চষে ফেলেন। সংগঠনও মজবুত করেন। এদিন গণনার প্রথম কয়েক রাউন্ডে তার প্রভাবও প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু বানারহাট থেকে বেরোতেই খেলা ঘুরতে শুরু করেছে। বিজেপি সদ্য প্রয়াত বিধায়কের আবেগ, সহানুভূতি কোনওটাই কাজে আসেনি এই ভোটে। তবে বিশ্লেষকরাই বলছেন, ক্লিন বোল্ড কিংবা মসৃণ জয় পেয়েছে তৃণমূল, তেমনটাও কিন্তু বলা যাবে না। কাঁটায় কাঁটায় লড়াই চলেছে। এদিকে, পরাজিত বিজেপি প্রার্থী তাপসী রায় বলেছেন, “মানুষের রায় মেনে নিতেই হবে। ” দলীয় প্রার্থী নির্মলচন্দ্র রায় জয়ী হতেই ধূপগুড়িতে সবুজ আবিরের ঝড়। চলছে মিষ্টি বিতরণ। দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় টুইট করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “‘ঘৃণা এবং ধর্মান্ধতার রাজনীতির বদলে উন্নয়নের রাজনীতি গ্রহণ করেছেন ধূপগুড়ির মানুষ। তার জন্য ধন্যবাদ।”জনসংযোগের জন্য তৃণমূল কর্মীদের স্যালুট জানান তিনি। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ” আমি ধূপগুড়ির মানুষকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। চা বাগান থেকে রাজবংশী, সবাই যেভাবে তৃণমূলকে সমর্থন করেছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। বিজেপির একটা শক্ত ঘাঁটি। বিজেপির মন্ত্রীরা সব ওখানে পড়েছিলেন। উত্তরবঙ্গের বড় জয়। সারা ভারতে নির্বাচন হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মত জায়গাতে বিজেপি হেরেছে। ত্রিপুরায় কাউকে লড়তে দেয়নি। ইন্ডিয়া জোটের বড় জয়।”রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসলে বিজেপির ‘বঙ্গ ভঙ্গ’ ইস্যুই ব্যুমেরাং হয়েছে। এই বিষয়টিকেও কাজে লাগাতে পেরেছে তৃণমূল। এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি আবেগকেও কাজে লাগাতে পেরেছে।উল্লেখ্য, একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে একটি উপনির্বাচনেও জয় পায়নি বিজেপি। বিধানসভা ভোটে জেতা দিনহাটা আর শান্তিপুরে উপনির্বাচনে হার হয়। ধূপগুড়িতেও মুখ রক্ষা হল না।
