নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ ব্যাঙ্ককর্মীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ। সাংসদ নুসরত জাহানের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ এখন বাংলার রাজনীতির হট টপিক! তদন্তে নেমে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এখন নয়, অনেক দিন আগে থেকেই এই প্রতারণার মামলার ছানবিন শুরু হয়েছিল। নুসরতের এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল রাজ্য প্রশাসনও। এমনকি নুসরতের বিরদ্ধে তদন্তে নেমে অভিযোগের সত্যতাও খুঁজে পেয়েছে কলকাতা পুলিশ। তারপরও নেওয়া হয়নি কোনও ব্যবস্থা।প্রতারিতদের অভিযোগ, তাঁরা প্রথমেই গড়িয়াহাট থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁদের অভিযোগ নেওয়াই হয়নি। পরে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন।
জানা যাচ্ছে, আদালতের নির্দেশে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) গড়িয়াহাট থানাকে দিয়ে আর্থিক প্রতারণার মামলার প্রাথমিক অনুসন্ধান করিয়েছিলেন। অভিযোগ গ্রহণ করতে বাধ্য হয় গড়িয়াহাট থানা।নুসরতের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক প্রতারণার অভিযোগের সত্যতা আগেই পেয়েছিল গড়িয়াহাট থানা, রিপোর্ট পড়ে আদালতেও, তারপরও… সেভেন সেন্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড’র ডিরেক্টর ছিলেন রাকেশ সিং, নুসরাত জাহান, রূপলেখা মিত্র-সহ মোট ৮ জন। অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে চলতি বছরের গত ৩০ জানুয়ারি ৬ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলিপুর আদালত অভিযুক্ত সংস্থার আট জনকে ২৩ শে ফেব্রুয়ারির দিন হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও নুসরত জাহান সেই সমনে হাজিরা দেননি।অর্থাৎ নুসরতের বিরুদ্ধে আগে থেকেই তদন্ত শুরু করেছিল কলকাতা পুলিশ। রাজ্য প্রশাসন গোটা বিষয়টিই জানত। কারণ জয়েন্ট সিপি ক্রাইমের নির্দেশে গড়িয়াহাট থানার সাব ইন্সপেক্টর গোটা তদন্তপ্রক্রিয়া চালিয়েছিলেন। অনুসন্ধানের রিপোর্টেও স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, অভিযোগের সত্যতা রয়েছে। তারপরও কেন কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি? কীভাবে আদালতের সমন এড়ালেন নুসরত। প্রশ্ন উঠছে, কেন প্রতারিতরা দ্বারস্থ হওয়া মাত্রই অভিযোগ গ্রহণ করল না গড়িয়াহাট থানা? কলকাতা পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্তাদেরই একাংশের ইঙ্গিত, সেখানে নুসরত জাহানের নাম থাকাতেই প্রথমটায় অভিযোগ নিতে ইতঃস্তত বোধ করেছিল থানা।
পরে আদালতের নির্দেশ এফআইআর নেওয়া হয়।রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “বিরাট দুর্নীতি। ওই বয়স্ক লোকরা আমার কাছে এসেছিলেন। সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে ওই সাংসদ যুক্ত। ১ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা একটা ফ্ল্যাটও কিনেছেন, বয়স্ক লোকগুলোর টাকা ডাইভার্ট করে। সব নথি আমাদের কাছে রয়েছে।”তবে এসবের পরেও নুসরতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমল দিতে চাইছে না তৃণমূল। সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি এসব ব্যাপার বিশ্বাসও করি না। আমি মনে করি না নুসরত এই ধরনের কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমি টিভিতে দেখেছি ব্যাপারটা। নুসরতের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। নুসরত আমাকে বলেছে, আমি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলছি।
”নুসরতের পাম অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাট নিয়ে প্রতারিতদের আইনজীবীর বক্তব্য, “আসল দলিলগুলো ব্যাঙ্কের কাছে জমা দেয়। সেই দলিলগুলো এখনও আছে। কিন্তু নুসরত সার্টিফায়েড কপি বার করে জমিগুলো রিসেল করে দেয়। নুসরত নিজেই ১ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা দিয়ে বাড়ি করেছেন। সেই টাকা আইওবি-র অ্যাকাউন্ট থেকেই এসেছে। অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাকাউন্টের টাকা থেকে চেক দিয়েছেন।” জানা যাচ্ছে, ওই রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের কর্মীদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, গড়িয়াহাট এলাকায় একটি আবাসন তৈরি করে তাঁদের ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। সেই ভিত্তিতেই সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মীরা দিয়েছিলেন।এবার প্রতারণার অভিযোগ সাংসদ নুসরতের বিরুদ্ধে। ফ্ল্যাট দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডা। ২০১৪ সালে ফ্ল্যাট দেওয়ার নামে ৪২৯ জনের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নুসরতের বিরুদ্ধে। আর প্রতারণার সেই টাকায় ফ্ল্যাট কেনেন নুসরত। নুসরতের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগের তদন্তে নেমে হাতে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা যাচ্ছে, সমবায়ে ফ্ল্যাট দেওয়ার নাম করে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের কর্মীদের থেকে টাকা তুলে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। যে সংস্থাকে ঘিরে মূলত অভিযোগ, তার অন্যতম ডিরেক্টর নুসরত। এবার তদন্তকারীদের নজরে সেই সংস্থা। জানা যাচ্ছে, ওই সংস্থার নাম ‘সেভেন সেন্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড’।তদন্তে জানা যাচ্ছে, সেই সংস্থারই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত বহু কর্মী অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে টাকা জমা করেছিলেন ফ্ল্যাট পাওয়ার জন্য। এই সংস্থার ডিরেক্টর ৭-৮ জন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রাকেশ সিং। তারপরই উঠে আসছে নুসরত জাহানের নাম, যাঁদের নামে ইতিমধ্যেই আদালতে মামলা চলছে।সেভেন সেন্সেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড’ সংস্থার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে গড়িয়াহাটের হেমন্ত মুখার্জি সরণি। কিন্তু ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা গেল, সংস্থার অফিস মেলেনি। রাকেশ সিংয়ের অফিসের সন্ধান করতে গিয়ে গড়িয়াহাট রোডের ‘পি-সিক্স’ সংস্থার হদিশ মেলে।
এটি একটি প্রোডাকশন হাউজ়, যেটিরও ডিরেক্টর রাকেশ সিং। তবে কর্মীদের দাবি, এই সংস্থায় ‘সেভেন সেন্সেস’ কোম্পানির কোনও কাজ হয় না।তদন্তে জানা গিয়েছে, ‘সেভেন সেন্সেস কোম্পানি’র ডিরেক্টরা প্রচুর সম্পত্তি কেনেন। তা বিক্রি করে আবার নিজেদের নামে সম্পত্তি কেনেন। তবে নুসরতের পক্ষের আইনজীবীদের দাবি, ১ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা দিয়ে পাম অ্যাভিনিউতে নিজেই নুসরত জাহান একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ সালের ঘটনা, কিন্তু ২০২৩ সালে এসে কেন এই পদক্ষেপ? সেই প্রশ্নের উত্তরে বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডা বলেন, “যে ৫০০ জনের কাছ থেকে তিনি টাকা লুটেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ১০০ জনের অন্তত মৃত্যু হয়েছে।
বেশিরভাগই সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। আর কবে তাঁরা বিচার পাবেন? সিনিয়র সিটিজেনদের তো এই টুকু ভরসা দেব।” তাঁর দাবি, যে কোনও মামলার একটা প্রসেস থাকে। ওঁরা প্রথমে গিয়েছিলেন গড়িয়াহাট থানায়। পুলিশ মামলা নেননি। আলিপুর আদালতে গিয়ে মামলা ফাইল করেছে। আদালত বলেছে এফআইআর করতে। এফআইআর হয়, পুলিশ রিপোর্ট জমা দেয়। আলিপুর কোর্টে দুবার সমন ইস্যু হয়। নুসরত যাননি। পুলিশ উল্টে নুসরতকেই সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ তাঁর। তবে বিজেপির অভিযোগকে আমল দিতে চায় না তৃণমূল। তৃণমূলের এক সাংসদ স্তরের নেতৃত্বের কথায়, “শঙ্কুর নিজের বিরুদ্ধেই তো নানা অভিযোগ । ও নিজে ওয়াশিং মেশিন ভাজপাতে গিয়ে শুদ্ধ হয়েছে।”
