আধিচেতনা

স্বামীজী।…..সকলেই যে নারায়ণ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু সকল নারায়ণে তো criticise (নিন্দা) করে না? কই, দীন-দুঃখীরা এসে মঠের খাট-ফাট দেখে তো criticise (নিন্দা) করে না। সৎকার্য করে যাব, যারা criticise করবে তাদের দিকে দৃকপাতও করব না—এই sense-এ (ভাবে) ‘লোক না পোক’ কথা বলা হয়েছে। যার ঐরূপ রোক আছে, তার সব হয়ে যায়, তবে কারও কারও বা একটু দেরিতে—এই যা তফাত। কিন্তু হবেই হবে। আমাদের ঐরূপ রোক (জিদ) ছিল, তাই একটু-আধটু যা হয় হয়েছে।

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য। ….মহাশয়, মঠের এ সব খাট-বিছানা দেখিয়া বাহিরের লোকে কত কি বলে !
স্বামীজী। ….বলতে দে না। ঠাট্টা করেও তো এখানকার কথা একবার মনে আনবে।
শত্রুভাবে শিগগির মুক্তি হয়। ঠাকুর বলতেন, ‘লোক না পোক’ ; এ কি বললে, ও কি বললে—তাই শুনে বুঝি চলতে হবে ? ছিঃ ছিঃ!
শিষ্য। …..মহাশয়, আপনি কখনো বলেন, “সব নারায়ণ, দীন-দুঃখী আমার নারায়ণ” আবার কখনো বলেন, ‘লোক না পোক’—ইহার অর্থ বুঝিতে পারি না।

স্বামীজী।…..সকলেই যে নারায়ণ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু সকল নারায়ণে তো criticise (নিন্দা) করে না? কই, দীন-দুঃখীরা এসে মঠের খাট-ফাট দেখে তো criticise (নিন্দা) করে না। সৎকার্য করে যাব, যারা criticise করবে তাদের দিকে দৃকপাতও করব না—এই sense-এ (ভাবে) ‘লোক না পোক’ কথা বলা হয়েছে। যার ঐরূপ রোক আছে, তার সব হয়ে যায়, তবে কারও কারও বা একটু দেরিতে—এই যা তফাত। কিন্তু হবেই হবে। আমাদের ঐরূপ রোক (জিদ) ছিল, তাই একটু-আধটু যা হয় হয়েছে। নতুবা কি সব দুঃখের দিনই না আমাদের গেছে; এক সময়ে না খেতে পেয়ে রাস্তার ধারে, একটা বাড়ির দাওয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলুম, মাথার ওপর দিয়ে এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেল তবে হুঁশ হয়েছিল। অন্য এক সময়ে সারাদিন না খেয়ে কলকাতায় একাজ সেকাজ করে বেড়িয়ে রাত্রি ১০/১১ টার সময় মঠে গিয়ে তবে খেতে পেয়েছি—এমন এক দিন নয়!

“ঠিক ঠিক সন্ন্যাস কি সহজে হয় রে? এমন কঠিন আশ্রম আর নেই। একটু বেচালে পা পড়লে তো একেবারে পাহাড় থেকে খাদে পড়ল—হাত পা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। একদিন আমি আগ্রা থেকে বৃন্দাবন হেঁটে যাচ্ছি একটা কানাকড়িও সম্বল নেই। বৃন্দাবনের প্রায় ক্রোশাধিক দূরে আছি, রাস্তার ধারে একজন লোক বসে তামাক খাচ্ছে দেখে বড়ই তামাক খেতে ইচ্ছে হলো। লোকটাকে বললুম, ‘ওরে ছিলিমটে দিবি?’ সে যেন জড়সড় হয়ে বললে, ‘মহারাজ, হার্ম ভাঙ্গি (মেথর) হ্যায়।’ সংস্কার কিনা! শুনেই পেছিয়ে এসে তামাক না খেয়ে পুনরায় পথ চলতে লাগলুম। খানিকটা গিয়েই মনে বিচার এল—তাইতো, সন্ন্যাস নিয়েছি, জাত কুল মান—সব ছেড়েছি, তবুও লোকটা মেথর বলাতে পেছিয়ে এলুম। তার ছোঁয়া তামাক খেতে পারলুম না। এই ভেবে প্রাণ অস্থির হয়ে উঠল, তখন প্রায় একপো পথ এসেছি, আবার ফিরে গিয়ে সেই মেথরের কাছে এলুম, দেখি তখনো লোকটা সেখানে বসে আছে। গিয়ে তাড়াতাড়ি বললুম, ওরে বাপ, ‘এক ছিলিম তামাক সেজে নিয়ে আয়।’ তার আপত্তি গ্রাহ্য করলুম না। বললুম, ছিলিমে তামাক দিতেই হবে। লোকটা কি করে ? অবশেষে তামাক সেজে দিল। তখন আনন্দে ধূমপান করে বৃন্দাবন এলুম। সন্ন্যাস নিয়ে জাতিবর্ণের পারে চলে গেছি কি-না পরীক্ষা করে আপনাকে দেখতে হয়। ঠিক ঠিক সন্ন্যাস-ব্রত রক্ষা করা কত কঠিন! কথায় ও কাজে একচুল এদিক-ওদিক হবার জো নেই।”

চিকাগো, ২৩শে জুন, ১৮৯৪
(রাও বাহাদুর নরসিংহাচারিয়াকে লিখিত)
প্রিয় মহাশয়,
আপনি আমাকে বরাবর যে অনুগ্রহ করিয়া থাকেন, তাহাতেই আমি আপনার নিকট একটি বিশেষ অনুরোধ করিতে সাহসী হইতেছি। মিসেস পটার পামার যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রধানা মহিলা। তিনি মহামেলার মহিলানেত্রী ছিলেন। সমগ্র জগতের স্ত্রীলোকদের অবস্থার যাহাতে উন্নতি হয়, সে বিষয়ে তিনি বিশেষ উৎসাহী, মেয়েদের একটি বিরাট প্রতিষ্ঠানের তিনি পরিচালিকা। তিনি লেডি ডফরিনের বিশেষ বন্ধু এবং তাঁহার ধন ও পদমর্যাদাগুণে ইউরোপীয় রাজপরিবারসমূহের নিকট হইতে তিনি অনেক অভ্যর্থনা পাইয়াছেন। এদেশে তিনি আমার প্রতি বিশেষ সদয় ব্যবহার করিয়াছেন। এক্ষণে তিনি চীন, জাপান, শ্যাম ও ভারত সফরে বাহির হইতেছেন।
অবশ্য ভারতের শাসনকর্তারা এবং বড় বড় লোকেরা তাঁহার আদর অভ্যর্থনা করিবেন। কিন্তু ইংরেজ রাজকর্মচারীদের সাহায্য ছাড়াই আমাদের সমাজ দেখিবার জন্য তিনি বিশেষ উৎসুক। আমি অনেক সময় তাঁহাকে ভারতীয় নারীদের অবস্থা উন্নত করিবার জন্য আপনার মহতী চেষ্টার এবং মহীশূরে আপনার চমৎকার কলেজটির কথা বলিয়াছি। আমার মনে হয়, আমাদের দেশের লোক আমেরিকায় আসিলে ইহারা যেরূপ সহৃদয় ব্যবহার করেন, তাহার প্রতিদানস্বরূপ এইরূপ ব্যক্তিদিগকে একটু আতিথেয়তা দেখানো কর্তব্য। আমি আশা করি, আপনারা তাঁহাকে সাদর অভ্যর্থনা করিবেন ও আমাদের স্ত্রীলোকনের যথার্থ অবস্থা একটু দেখাইতে সাহায্য করিবেন। তিনি মিশনারি বা গোঁড়া খ্রীষ্টান নহেন—আপনি সে ভয় করিবেন না। ধর্মনিরপেক্ষভাবে তিনি সমগ্র জগতের স্ত্রীলোকদের অবস্থার উন্নতির চেষ্টাই করিতে চান। তাঁহার উদ্দেশ্যসাধনে এইরূপে সহায়তা করিলে এদেশে আমাকেও অনেকটা সাহায্য করা হইবে। প্রভু আপনাকে আশীর্বাদ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *