( পর্ব ২) শিলিগুড়ি মহকুমার হাট

আগেই এখানে শুরু হয়েছিল নয়টি হাটের /যার মধ্যে পাঁচটি হাটই ছিল বালাসন উপত্যকায় এই হাটগুলি হলো ভৈষমারী ,খাপড়াইল,শালবাড়ি,গাড়িধুরা ও পানিঘাটা / বাকি চারটি হলো দেবীগঞ্জ বা হাঁসকোয়া ,বির্নাবাড়ি,যুদির হাট ও ক্রিস্টোপুর (Babu Sasi Bhusan Dutta)/প্রথম দুটি ফাঁসিদেওয়া ও খড়িবাড়ি থানাতে অবস্থান হলেও বাকি দুটির স্থান ছিল নক্সালবাড়ি থানা অঞ্চলে /

অশেষ কুমার দাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ ফলে কর আদায়ের পরিমান বাড়তে থাকে ও চা চাষের জন্যে প্রাথমিক খরচ কমতে থাকে / 1864 সালে মহকুমাতে প্রথম ‘”‘”‘চামটা চা বাগান বাণিজ্যিক ভাবে চা উৎপাদন শুরু করে /
কৃষি ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি শিলিগুড়ি মহকুমা ব্যবসা বাণিজ্যতে কিন্তু পিছিয়ে ছিল না / ইংরেজ আসার আগেই এখানে শুরু হয়েছিল নয়টি হাটের /যার মধ্যে পাঁচটি হাটই ছিল বালাসন উপত্যকায় এই হাটগুলি হলো ভৈষমারী ,খাপড়াইল,শালবাড়ি,গাড়িধুরা ও পানিঘাটা / বাকি চারটি হলো দেবীগঞ্জ বা হাঁসকোয়া ,বির্নাবাড়ি,যুদির হাট ও ক্রিস্টোপুর (Babu Sasi Bhusan Dutta)/প্রথম দুটি ফাঁসিদেওয়া ও খড়িবাড়ি থানাতে অবস্থান হলেও বাকি দুটির স্থান ছিল নক্সালবাড়ি থানা অঞ্চলে / প্রথম পাঁচটি হাট এ যাওয়া আসার জন্যে মানুষ বালাসন নদী পথ ব্যবহার করতো / এই নদী পথে মহকুমা মানচিত্র এ দুটি ঘাটের নাম রয়েছে, সেই দুটি হলো পাথুরঘাটা ও পানি ঘাটা /ইংরেজ ভাষ্যকার হান্টারের বিবরণ অনুযায়ী পানিঘাটার পরে বালাসন নদীতে ছিল প্রচুর পরিমানে পাথর /হয়তো সেই কারণে নদীতে নৌকা চলাচল করতে পারতো না /ধারণা করা যেতে পারে যে হাটের ক্রেতা ও বিক্রেতারা এই ঘাট দুটি তে নেমে তাদের প্রয়োজন মতো গরুর গাড়িতে যাওয়া আসা করতো /শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী সিকিম ও ভুটান থেকেও ক্রেতারা এই পাঁচটি হাট এ নিয়মিত আসতো /কাপড়, মাংস, মশলা, লবন সহ নানা prosongoরকমের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাহাড়িরা এই হাট

থেকে ক্রয় করতো /হাট গুলোর নাম থেকে এই বিষয়ে একটা ধারণা করা যায় / কাপড়ের হাট, নাম তার খাপরুল /কথাটি এসেছে বোরো শব্দ ভান্ডার থেকে অর্থ হলো ”” যেখানে শক্ত করে বাঁধা হয় ‘”‘”‘ এবং এখানে কিন্তু সত্যি সত্যি শক্ত করে বাঁধা হতো /কিন্তু কি এবং কেন বাঁধা হতো,এই প্রশ্ন থেকেই যায় / স্থান নাম থেকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যায় যে এখানে বোরো বা যেচ জনগোষ্ঠীর প্রভাব ছিল / স্থানটি ছিল অরণ্য বহুল অঞ্চল / এই অরণ্যেই প্রচুর পরিমানে শিমুল তুলার গাছ জন্মাতো / এই গোষ্ঠীর মানুষেরা সামাজিক শান্তি বজায় রেখে গাছের দখল নিতো এবং গাছের পাশে কলাই ডালের চাষ করতো /প্রয়োজন মতো ওই গাছের থেকে তুলাও উৎপাদন করতো /সেই তুলে দিয়েই তারা সুতা তৈরী করে কাপড় উৎপাদন করতো / সেই সময় পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা কাপড় উৎপাদন করতে জানতো না /হয়তো সে কারণেই যেচ বা বোরো গোষ্ঠীর উৎপাদিত কাপড়ের চাহিদা পাহাড়ে প্রচুর পরিমানে ছিল /প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে ভুটানরাজ কোন এক সময় ডুয়ার্স থেকে বেশ কিছু মানুষ তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিলো কাপড় বোনার জন্যে / পরে তারা পুনরায় ডুয়ার্সে ফিরে আসে ও দোভাষীয়া নামে পরিচিত হয় (DHE Sunders)/এই দোভাষীযারা ভুটানের মানুষদের কাপড় বোনার কাজ শিখিয়েছিলো /

পাহাড়ের মানুষেরা কোন পথে খাপড়াইল হাট এ আসতো এবং কি ভাবে আসতো ? সেই প্রশ্ন থেকেই যায় / পাহাড়ি ক্রেতার দল ঘোড়া, গাধা বা খচ্ছরের পিঠে ছোড়ে বালাসন নদীর পথ ধরে এই সমতল ভূমিতে নেমে আসতো /খাপড়াইল এলাকাটি অরণ্য বহুল ছিল, তাই তারা তাদের প্রাণী গুলোকে শক্ত করে বেঁধে রাখতো /ফলে প্রাণীগুলো অরণ্যে প্রবেশ করতে পারতোনা এবং ক্রেতার দল নিশ্চিন্ত মনে তাদের কেনাকাটা করতে পারতো /কাপড় ক্রয় করার পর সেগুলো শক্ত করে বেঁধে পশু বা বাহনের পিঠে চড়ানো হতো / ধারণা করা যেতেই পারে যে কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে বাঁধার কাজ চলতো / এই হাটএর প্রধান বিক্রেতা ছিল বোরো বা মেচ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা /মহকুমার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা আসতো / তার মধ্যে অন্যতম ছিল চম্পাসারি, খোপলাশী মৌজা / চম্পাসারি মৌজাটি আসলে চম্পামারী নামে পরিচিত ছিল / এই শব্দটি হলো বোরো বা মেচ জনগোষ্ঠীর পদবি /কালের নিয়মে জনবিন্যাসের সাথে সাথে নামটি বিকৃত হয়ে যায় /খাপড়াইল মৌজার পাশেই ছিল শিমুলবাড়ী নামের আরএকটি মৌজা /খুব সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে কাপড় উৎপাদকদের কাঁচা মালের অভাব হতো না /হাট গুলোতে কাপড়ের যোগান নিয়মিত থাকতো /

বালাসনের তীরে পানিঘাটা হাট বিখ্যাত ছিল রকমারি দ্রব্যের জন্যে / প্রতি রবিবাড়ে এই হাট বসত এবং স্বদেশী ও বিদেশী ক্রেতারা আসতো / বর্তমান বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া থেকে বহু বিক্রেতা বালাসন নদীতে নৌকা ভাসিয়ে এখানে ব্যবসা করতে আসতো /তাদের দ্রব্যের মধ্যে থাকতো লবন, চিনি,গুড়,বিভিন্ন ধরণের মশলা ও ডাল সহ বহু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য /মহকুমার পশ্চিম প্রান্তের মানুষ ও এই হাট এ আসতো নানাধরণের দ্রব্য ক্রয় করতে /নেপাল থেকে কিছু মানুষ আসতো শুধু মাত্র রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্যে জড়িবুটি জাতীয় ওষুধ কিনতে /জড়িবুটি যারা বিক্রি করতো, তারা নানাভাবে নাচ গান করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো /তাছাড়াও দাঁতের মাজন ছিল অন্যতম আকর্ষণ / পরম্পরা গত ভাবে বহু ব্যবসায়ী এই কাজে যুক্ত ছিল /তারা কবিরাজের মর্যাদা পেত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে /পানিঘাটা হাট ছিল যেন সাধারণ মানুষের কাছে একটি মিলন মঞ্চ / যেখানে তারা সমগ্র পৃথিবীর মানুষের খবর পেতো / পানিঘাটার এই হাট কে যেন ”সাধারণ মানুষের বিশ্ববিদ্যালয় ‘ বলা যায় /তেঁতুলিয়াতে বালাসন নদী,মহানন্দার সাথে মিলিত হয়েছে / সে কারণে ব্যবসায়ীদের হাট এ আসার জন্যে কোন অসুবিধা হতো না / বরঞ্চ বলা যায় যে এই হাটের দিনটিতে সমগ্র মহকুমাটি যেন বৃহত্তর দুনিয়ার স্বাদ পেত /

খাপড়াইল হাট যেমন কাপড়ের জন্যে বিখ্যাত ছিল, তেমনি মাংসোর জন্যে খ্যাতি ছিল মহিষ মারি মৌজার ””ভোইস যারি ” হাট/নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে হাটের বিক্রিত দ্রব্যের নাম / এই হাট প্রতি শনিবার বসত / ধারণা করা যায় যে পাহাড়িয়া ব্যবসায়ীরা প্রতি শনিবার ভোইস মাড়ির হাট থেকে মাংস ক্রয় করে কোথাও রাত্রিতে থাকতো /পরদিন খাপড়াইল হাট থেকে কাপড় কিনে পাহাড়ের পথে পারি দিতো /পাহাড়ের কোন কোন জনগোষ্ঠী এই মাংস শুকিয়ে ঘরে রেখে দিতো এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতো / প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে পাহাড়িয়াদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব থাকায় তারা প্রাণীর মাংস খেলেও প্রাণী হত্যা করতো না / সে সমস্ত কারণেই তারা সমতল ভূমি থেকে মাংস ক্রয় করতে বাধ্য ছিল /এই হাটটির পরিকাঠামো বলতে ছিল ””মহিষ যারি ”” নামে একটি নদী বা ঝোরা / ( চলবে )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *