মহকুমার ইতিহাস বলতে দেশীয় রাজ্য পূর্ণিয়া কোন এক সময় বাঙালি হিন্দু রাজা শাসন করতেন /তারপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইংরেজদের দখলে আসে / প্রতিবেশী সিকিমে 1641 সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজতন্ত্র স্থাপিত হলে সিকিমরাজ পূর্ব মোরাং দখল করে
অশেষ কুমার দাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ বৈকুণ্ঠপুর পরগনার কিছু অংশ,পূর্ণিয়া জেলার ফাঁসিদেয়া ও পূর্ব মোরাং নিয়ে গঠিত আধুনিক কালের স্থানটির নাম শিলিগুড়ি মহকুমা / ভৌগলিক মানচিত্রে যার অবস্থান 26 ডিগ্রি 30 মিনিট 48সেকেন্ড থেকে 26 ডিগ্রি 49 মিনিট 45 সেকেন্ড উত্তর অখ্যাংস ও ৪৪ ডিগ্রি 8 মিনিট 51 সেকেন্ড theke88 ডিগ্রি 29মিনিট পর্যন্ত / এই মহকুমার উত্তরে কার্শিয়ং ও নেপাল, দক্ষিণে জলপাইগুড়ি জেলা,পূর্বদিকে ডুয়ার্স ও পশ্চিমে বিহার রাজ্য ও উত্তর দিনাজপুর জেলা /মেচি বালাসন, মহানন্দা, চ্যাঙ্গা সহ বিভিন্ন ঝরা বা জলপ্রবাহ এখানকার প্রধান নদী / তাছাড়াও রয়েছে প্রচুর অরণ্য / যেমন সেভক, দলকা ঝাড়, টুকুরিয়া ও পানিঘাটা উল্লেখ যোগ্য /কোন এক সময় মহানন্দা ও বালাসন নদীতে নৌকা বারো মাস চলাচল করতো /অরণ্যের বিভিন্ন ধরণের পশু ও পাখি সহ মানুষ এই জলে পিপাসা দূর করতো /সুখ মরশুমে এই জলাভূমির জমে থাকা জলে জন্ম নিতো ম্যালেরিয়ার মশা, যার কামড়ে প্রায় সম্পূর্ণ মহকুমা জুড়ে শুরু হতো যড়ক /আর মানুষের সংলাপ যেন পরিণত হতো হাহাকরে /
মহকুমার ইতিহাস বলতে দেশীয় রাজ্য পূর্ণিয়া কোন এক সময় বাঙালি হিন্দু রাজা শাসন করতেন /তারপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইংরেজদের দখলে আসে / প্রতিবেশী সিকিমে 1641 সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজতন্ত্র স্থাপিত হলে সিকিমরাজ পূর্ব মোরাং দখল করে /বৈকুণ্ঠপুর শাসন করতেন রায়কোতরা /সেখানেও সুকৌশলে ইংরেজ শাসন শুরু হয়ে ছিল /1933 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা সিক্কিমের কাছ থেকে দার্জিলিং কে দেন হিসাবে পাওয়ার পর তাদের সিকিমের মাটি অতিক্রম করে যেতে হতো / এরকম একটি ঘটনায় দুজন ইংরেজকে সিকিমরাজ বন্দি করেন / প্রতিবাদে ইংরেজরা সিকিম আক্রমণ করে পূর্ব মোরাং দখল করে 1950 সালে /1864 সালে দার্জিলিং জেলা গঠনের সময় এই তিনটি অঞ্চল মিলিয়ে গঠিত হয় তরাই মহকুমা /এই মহকুমার সদর দপ্তর প্রথমে ছিল ফাঁসিদেওয়ার হাঁসকয়াতে / 1881 সালে সেটা শিলিগুড়িতে স্থানান্তরিত হয় / 1907 সালের 25 যে শিলিগুড়িকে মহকুমা রূপে ঘোষণা করা হয় /
ধারণা করা যেতে পারে যে ভারতবর্ষের উত্তর পূর্বাঞ্চলে মঙ্গোলয়েড নৃ গোষ্ঠী শাসনের অবসান হলে মঙ্গোলরা বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং রাজ্যের প্রান্ত সীমায় বাস করতে শুরু করে (চারুচন্দ্র সান্যাল)/নবাগত শাসক অস্ট্রিকরা তাদের কিন্তু হত্যা করে নি, কারণ প্রয়োজনে মোঙ্গলদের থেকে সেনা সংগ্রহের কারণে /তারপর থেকেই মঙ্গোলরা অতীতের তরাই বা বর্তমানের শিলিগুড়িকে নিরাপদ ভূমি করে গড়ে তোলে / মূলত বাঙালি রাজবংশী, মেচ, থারু, ধিমালাদের সাথে বাঙালিরাও এখানে বাস করতো / 1851 সালে ক্যাম্পবেলের বিবরণ অনুযায়ী শুধু মাত্র পূর্ব মোরাং এ প্রায় 37000 মানুষ বাস করতো / তাদের জীবিকা বলতে ছিল কৃষি কাজ ও নানা ধরণের কুটির শিল্প / ফাঁসিদেওয়াতে 300 পরিবারের জীবিকা ছিল কাপড় বোনা /তাছাড়াও মাটির নানা ধরণের পাত্র ও কাঠ এবং বাঁশের তৈরী বিভিন্ন আসবাবপত্র সহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য তারা তৈরী করতো /
প্রতিটি মানুষ ছিল স্বনির্ভর /জীবন ধারণের মান ও ছিল খুব সাধারণ /খাবার বলতে ছিল ভাতের সাথে সবজি সহ মাছ / বিত্তবানেরা ডাল খেত /তবে ধনী ও গরিব সহ সকলেই তিন বার করে দুধ পান করতো / অসুখ হলে নানা ধরণের ভেষজ দ্রব্য ও গরম জল ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করতো /তাছাড়াও আরোগ্য লাভের জন্যে গ্রাম দেবতা, কালিঠাকুর, বিষহরি সহ নানা দেবদেবীর পূজা তারা করতো /নিকট বর্তী অরণ্য থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে গৃহ নির্মাণ ছাড়াও মধু ও মোম সহ জ্বালানি, গবাদি পশুর খাবার,এবং মাঝে মাঝে শিকার ছিল তাদের যাপন চিত্রের অন্যতম /তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের ভিন্ন ভিন্ন পার্বন বা উৎসবে শিকারে যেত / তাদের সাংস্কৃতিক জীবনে যার ছাপ পাওয়া যায় / বলা উচিত যে সেই সময় তারা যা না শিকার করতো,তার তুলনায় তাদের গৃহ পালিত প্রাণীরা অনেক বেশি শিকার হতো বন্য জন্তু দেড় দ্বারা / 1850 সালের আগে শিলিগুড়ি মহকুমাতে মোট 544 জন জোতদার ছিল /তাদের কাজ ছিল চাষীদের কাছ থেকে কর আদায় করে রাজকোষে জমা করা (compendium)/বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে চাষীরা কে কি পরিমান জমি চাষ করবে, তা জোতদার কে জানাতে হতো /পূর্ব মোরঙের জোতদাররা কর আদায় করে খাপরুল মৌজাতে সিকিম রাজ্যের রাজস্ব দপ্তরে জমা দিতো / মহকুমাতে ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার পর 1953 সালে প্রথম ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস শুরু হয় / তাদের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্য নিধন করে চাষ আবাদের ভূমি বাড়ানো /সে কারনে ‘চৌধুরী পদবীধারী কিছু মানুষকে কলকাতার প্রতিবেশী অঞ্চল থেকে নিয়োগ করা হয় / চৌধুরীরা বেতন হিসাবে আদায়কৃত খাজনার দশ শতাংশ পেতো ও অরণ্য নিধন করে চাষ আবাদ করলে প্রথম পাঁচ বছর তাদের কোন কর দিতে হতো না / এই ব্যবস্থার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল চা চাষের আয়তন বৃদ্ধি করা এবং জোতদারএর সংখ্যা বাড়ানো / (চলবে)
