গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ শিষ্য। ….মহাশয়, মেয়েদের মঠে মেয়েরা শিক্ষালাভ করিয়াও যদি মেয়েরা বিবাহ করে, তবে আর তাহাদের ভিতর আদর্শ জীবন কেমন করিয়া লোকে দেখিতে পাইবে? এমন নিয়ম হইলে ভাল হয় নাকি যে, যাহারা এই মঠে শিক্ষালাভ করিবে তাহারা আর বিবাহ করিতে পারিবে না ?
স্বামীজী।….তা কি একেবারেই হয় রে? শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তারপর নিজেরাই ভেবে চিন্তে যা হয় করবে। বে করে সংসারী হলেও ঐরূপে শিক্ষিতা মেয়েরা নিজ নিজ পতিকে উচ্চভাবের প্রেরণা দেবে এবং বীর পুত্রের জননী হবে। কিন্তু স্ত্রী-মঠের ছাত্রীদের অভিভাবকেরা ১৫ বৎসরের পূর্বে তাদের বে দেবার নামগন্ধ করতে পারবে না—এ নিয়ম রাখতে হবে।
……. যারা চিরকুমারীব্রত অবলম্বন করবে, তারাই কালে এই মঠের শিক্ষয়িত্রী ও প্রচারিকা হয়ে দাঁড়াবে এবং গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে centres (শিক্ষাকেন্দ্র) খুলে মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারে যত্ন করবে। চরিত্রবতী, ধর্মভাবাপন্না ঐরূপ প্রচারিকাদের দ্বারা দেশে যথার্থ স্ত্রী-শিক্ষার বিস্তার হবে। স্ত্রী-মঠের সংস্রবে যতদিন থাকবে, ততদিন ব্রহ্মচর্য রক্ষা করা এ মঠেরও ভিত্তিস্বরূপ হবে। ধর্মপরায়ণতা, ত্যাগ ও সংযম এখানকার ছাত্রীদের অলঙ্কার হবে; আর সেবাধর্ম তাদের জীবনব্রত হবে। এইরূপ আদর্শ-জীবন দেখলে কে তাদের না সম্মান করবে—কেই বা তাদের অবিশ্বাস করবে ? দেশের স্ত্রীলোকদের জীবন এইরূপে গঠিত হলে তবে তো তোদের দেশে সীতা, সাবিত্রী, গার্গীর আবার অভ্যুত্থান হবে। দেশাচারের ঘোর বন্ধনে প্রাণহীন, স্পন্দনহীন হয়ে তোদের মেয়েরা এখন কি যে হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা একবার পাশ্চাত্য দেশ দেখে এলে বুঝতে পারতিস। মেয়েদের ঐ দুর্দশার জন্য তোরাই দায়ী। আবার দেশের মেয়েদের পুনরায় জাগিয়ে তোলাও তোদের হাতে রয়েছে। তাই বলছি, কাজে লেগে যা। কি হবে ছাই শুধু কতকগুলো বেদ-বেদান্ত মুখস্থ করে ?
শিষ্য।……. মহাশয়, তাহা হইলে সমাজে ঐ সকল মেয়েদের কলঙ্ক রটিবে। কেহই তাহাদের আর বিবাহ করিতে চাহিবে না।
স্বামীজী। …..কেন চাইবে না ? তুই সমাজের গতি এখনো বুঝতে পারিসনি। এইসব বিদুষী ও কর্মতৎপরা মেয়েদের বরের অভাব হবে না। দশমে কন্যকাপ্রাপ্তিঃ —সেসব বচনে এখন সমাজ চলছে না, চলবেও না। এখনি দেখতে পাচ্ছিস নে ?
শিষ্য।….. যাহাই বলুন, কিন্তু প্রথম প্রথম ইহার বিরুদ্ধে একটা ঘোরতর আন্দোলন হইবে।
স্বামীজী। ……তা হোক না। তাতে ভয় কি ? সৎসাহসে অনুষ্ঠিত সৎকার্যে বাধা পেলে অনুষ্ঠাতাদের শক্তি আরও জেগে উঠবে। যাতে বাধা নেই, প্রতিকূলতা নেই তাতে মানুষকে মৃত্যুপথে নিয়ে যায়। Struggle (বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করিবার চেষ্টা)-ই জীবনের চিহ্ন। বুঝেছিস ?
শিষ্য। ….আজ্ঞে হাঁ।
স্বামীজী। ……পরমব্রহ্মতত্ত্বে লিঙ্গভেদ নেই। আমরা ‘আমি-তুমি’র plane এ (ভূমিতে) লিঙ্গভেদটা দেখতে পাই; আবার মন যত অন্তর্মুখ হতে থাকে ততই ঐ ভেদজ্ঞানটা চলে যায়। শেষে মন যখন সমরস ব্রহ্মতত্ত্বে ডুবে যায়, তখন আর এ স্ত্রী, ও পুরুষ—এই জ্ঞান একেবারেই থাকে না। আমরা ঠাকুরে ঐরূপ প্রত্যক্ষ দেখেছি। তাই বলি, মেয়ে-পুরুষে বাহ্যভেদ থাকলেও স্বরূপতঃ কোন ভেদ নেই। অতএব পুরুষ যদি ব্রহ্মজ্ঞ হতে পারে তো স্ত্রীলোক তা হতে পারবে না কেন? তাই বলছিলুম মেয়েদের মধ্যে একজনও যদি কালে ব্রহ্মজ্ঞা হন, তবে তাঁর প্রতিভাতে হাজারো মেয়েমানুষ জেগে উঠবে, এবং দেশের ও সমাজের কল্যাণ হবে। বুঝলি ?
