আধিচেতনা

গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ স্বামীজী। আমি দুনিয়া ঘুরে দেখলুম—এ দেশের মতো এত অধিক তামসপ্রকৃতির লোক পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাহিরে সাত্ত্বিকতার ভান, ভিতরে একেবারে ইট-পাটকেলের মতো জড়ত্ব—এদের দ্বারা জগতের কি কাজ হবে ? এমন অকর্ম, অলস, শিশ্নোদরপরায়ণ জাত দুনিয়ায় কতদিন আর বেঁচে থাকতে পারবে ? ওদেশ (পাশ্চাত্য) বেড়িয়ে আগে দেখে আয়, পরে আমার ঐ কথার প্রতিবাদ করিস। তাদের জীবনে কত উদ্যম, কত কর্মতৎপরতা, কত উৎসাহ, কত রজোগুণের বিকাশ ! তোদের দেশের লোকগুলোর রক্ত যেন হৃদয়ে রুদ্ধ হয়ে রয়েছে—ধমনীতে যেন আর রক্ত ছুটতে পারছে না —সর্বাঙ্গে paralysis (পক্ষাঘাত) হয়ে যেন এলিয়ে পড়েছে ! আমি তাই এদের ভিতর রজোগুণ বাড়িয়ে কর্মতৎপরতা দ্বারা এদেশের লোকগুলোকে আগে ঐহিক জীবনসংগ্রামে সমর্থ করতে চাই।

শরীরে বল নেই—হৃদয়ে উৎসাহ নেই—মস্তিষ্কে প্রতিভা নেই ! কি হবে রে, এই জড়পিণ্ডগুলো দ্বারা ?—আমি নেড়ে চেড়ে ওদের ভিতর সাড়া আনতে চাই—এজন্য আমার প্রাণান্ত বেদান্তের অমোঘ মন্ত্রবলে এদের জাগাব। ‘উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত এই অভ শুনাতেই আমার জন্ম । তোরা ঐ কার্যে আমার সহায় হ। যা গায়ে গায়ে, দেশে দেশে এই অভয়বাণী আচণ্ডালব্রাহ্মণকে শুনাগে! সকলকে ধরে ধরে বলতে যা—তোমরা অমিতবীর্য, অমৃতের অধিকারী । এইরূপে আগে রজঃশক্তির উদ্দীপনা কর—জীবনসংগ্রামে সকলকে উপযুক্ত কর, তারপর পরজীবনে মুক্তিলাভের কথা তাদের বল। আগে ভেতরের শক্তি জাগ্রত করে দেশের লোককে নিজের পায়ের ওপর দাড় করা, উত্তম অশন-বসন—উত্তম ভোগ আগে করতে শিখুক, তারপর সর্বপ্রকার ভোগের বন্ধন থেকে কি করে মুক্ত হতে পারবে, তা বলে দে ।

আলস্য, হীনবুদ্ধিতা, কপটতায় দেশ ছেয়ে ফেলেছে—বুদ্ধিমান লোক এ দেখে কি স্থির হয়ে থাকতে পারে ? কান্না পায় না ? মাদ্রাজ, বোম্বে, পাঞ্জাব, বাংলা — যেদিকে চাই, কোথাও যে জীবনীশক্তির চিহ্ন দেখি না ! তোরা ভাবছিস—আমরা শিক্ষিত । কি ছাই মাথামুণ্ড শিখেছিস ? কতকগুলি পরের কথা ভাষান্তরে মুখস্থ করে মাথার ভেতরে পুরে পাস করে ভাবছিস—আমরা শিক্ষিত ! ছ্যাঃ! ছ্যাঃ! এর নাম আবার শিক্ষা !! তোদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কি ? হয় কেরাণীগিরি, না হয় একটা দুষ্ট উকিল হওয়া, না হয় বড় জোর কেরাণীগিরিরই রূপান্তর একটা ডেপুটিগিরি চাকরি—এই তো। এতে তোদেরই বা কি হলো, আর দেশেরই বা কি হলো ? একবার চোখ খুলে দেখ, স্বর্ণপ্রসূ ভারতভূমিতে অন্নের জন্য কি হাহাকারটা উঠেছে ! তোদের ঐ শিক্ষায় সে অভাব পূর্ণ হবে কি?—কখনো নয়। পাশ্চাত্যবিজ্ঞান-সহায়ে মাটি খুঁড়তে লেগে যা, অন্নের সংস্থান কর—চাকুরি গুখুরী করে নয়—নিজের চেষ্টায় পাশ্চাত্যবিজ্ঞান-সহায়ে নিত্য নতুন পন্থা আবিষ্কার করে। ঐ অন্নবস্ত্রের সংস্থান করবার জন্যই আমি লোকগুলোকে রজোগুণতৎপর হতে উপদেশ দিই। অন্নবস্ত্রাভাবে, চিন্তায় চিন্তায় দেশ উৎসন্ন হয়ে গেছে—তার তোরা কি কচ্ছিস ? ফেলে দে তোর শাস্ত্রফাস্ত্র গঙ্গাজলে। দেশের লোকগুলোকে আগে অন্নসংস্থান করবার উপায় শিখিয়ে দে, তারপর ভাগবত পড়ে শুনাস ।
শিষ্য। কিন্তু মহাশয়, ঐরূপ কার্যে লাগিয়াই বা কি হইবে ? মৃত্যু তো পশ্চাতে।
স্বামীজী। দূর ছোড়া, মরতে হয় একবারই মরবি । কাপুরুষের মতো অহরহঃ মৃত্যু-চিন্তা করে বারে বারে মরবি কেন ?
শিষ্য। আচ্ছা মহাশয়, মৃত্যু-চিন্তা না হয় নাই করিলাম, কিন্তু এই অনিত্য সংসারে কর্ম করিয়াই বা ফল কি ?
স্বামীজী। ওরে, মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন ইট-পাটকেলের মতো মরার চেয়ে বীরের ন্যায় মরা ভাল । এ অনিত্য সংসারে দুদিন বেশি বেঁচেই বা লাভ কি? It is better to wear out than to rust out—জরাজীর্ণ হয়ে একটু একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মরার চেয়ে বীরের ন্যায় অপরের এতটুকু কল্যাণের জন্যও লড়াই করে ফস করে মরাটা ভাল নয় কি ?
শিষ্য। আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনাকে আজ অনেক বিরক্ত করিলাম ।
স্বামীজী।

ঠিক ঠিক জিজ্ঞাসুর কাছে দুরাত্রি বকলেও আমার শ্রান্তি বোধ হয় না, আমি আহার নিদ্রা ত্যাগ করে অনবরত বকতে পারি ইচ্ছা করলে তো আমি হিমালয়ের গুহায় সমাধিস্থ হয়ে বসে থাকতে পারি। আর আজকাল দেখছিস তো মায়ের ইচ্ছায় কোথাও আমার খাবার ভাবনা নেই, কোন না কোন রকম জোটেই জোটে ; তবে কেন ঐরূপ করি না ? কেনই বা এদেশে রয়েছি ? কেবল দেশের দশা দেখে ও পরিণাম ভেবে আর স্থির থাকতে পারি নে ।
সমাধি-ফমাদি তুচ্ছ বোধ হয়—’তুচ্ছং ব্রহ্মপদং’ হয়ে যায়। তোদের মঙ্গল কামনা হচ্ছে আমার জীবনব্রত। যে দিন ঐ ব্রত শেষ হবে, সেদিন দেহ ফেলে চোঁচা দৌড় মারব !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *