রিঞ্জয় মিত্র,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ বাংলায় নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে পরের পর মামলা দায়েরের জন্য বার বার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতৃত্ব নিশানা করেছেন আইনজীবী এবং সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে৷ আবার জাতীয় রাজনীতিতে যাই হোক না কেন, রাজ্যে তৃণমূলকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী৷
কিন্তু রাজনীতি অঙ্কের খেলা৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সমীকরণ৷ তাই রাজ্য রাজনীতিতে যাই হোক না কেন, মণিপুর ইস্যুতে দিল্লিতে একজোট হয়ে বিক্ষোভ দেখালেন সেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অধীররঞ্জন চৌধুরী সহ বিরোধী জোটের সাংসদরা৷মণিপুর ইস্যুতে এ দিন সকাল থেকেই দিল্লিতে সংসদ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিরোধী দলের সাংসদরা৷ বেঙ্গালুরুতে গঠিত ইন্ডিয়া জোটের শরিক অধিকাংশ দলের সাংসদরাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ মণিপুর ইস্যুতে সংসদে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিবৃতি দিতে হবে, এই দাবিতে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিরোধী দলের সাংসদরা।অমিত শাহের ‘প্রস্তাব’ খারিজ করে দিল বিরোধীরা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার লোকসভায় জানিয়েছিলেন, বিরোধী শিবির সংসদে অচলাবস্থা সৃষ্টি না করলে মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় রাজি সরকারপক্ষ। কিন্তু মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিবৃতির দাবিতে অনড় ‘ইন্ডিয়া’ জোট সে প্রস্তাব মানতে রাজি হয়নি।
মণিপুরকাণ্ড নিয়ে বিক্ষোভ দেখানোর ‘অপরাধে’ আম আদমি পার্টি (আপ)-র রাজ্যসভা সাংসদ সঞ্জয় সিংহকে সোমবার গোটা বাদল অধিবেশন পর্বের জন্য সাসপেন্ড করেন উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড়। ফলে যুযুধান দু’পক্ষের তিক্ততা আরও বাড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।মণিপুরে গত পৌনে তিন মাসের হিংসাপর্ব এবং দুই মহিলাকে বিবস্ত্র করে হাঁটানোর ভিডিয়ো (যার সত্যতা আনন্দবাজার অনলাইন যাচাই করেনি) এবং গণধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে সোমবারও লোকসভা এবং রাজ্যসভায় সরব হয়েছেন বিরোধী সাংসদেরা। বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, সংসদ ভবন চত্বরেও। আর ‘জবাবে’ পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান-সহ কয়েকটি বিরোধী শাসিত রাজ্যে নারী নির্যাতন নিয়ে অধিবেশনকক্ষের ভিতরে-বাইরে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে বিজেপি। সংঘাতের এই আবহে সোমবারও মুলতুবি হয়ে গিয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশনের তৃতীয় দিনও।
গত বৃহস্পতিবার বাদল অধিবেশনের সূচনার আগে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্যেই ইঙ্গিত মিলেছিল যে মণিপুরকাণ্ডে চাপের মুখে পড়ে পুরোদমে প্রতিআক্রমণের পথে হাঁটবে বিজেপি। গত পৌনে তিন মাস ধরে মণিপুরে ধারাবাহিক হিংসা এবং নারী নির্যাতনের ঘটনার জবাবে এ বার অ-বিজেপি রাজ্যগুলিতে মহিলাদের উপর সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযোগ ঘিরে পাল্টা প্রচারে নেমেছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে বাংলার পাশাপাশি রাজস্থান, বিহারের মতো রাজ্যকে নিশানা করেন স্মৃতি ইরানি, অনুরাগ ঠাকুর, লকেট চট্টোপাধ্যায়, অমিত মালবীয়রা।প্রসঙ্গত, গত বুধবার তৃণমূলের সংসদীয় দলের মণিপুর সফরের সময়েই সে রাজ্যের থৌবল এবং কঙ্গপকপি জেলার সীমানায় দুই মহিলাকে বিবস্ত্র করে হাঁটানোর ঘটনা বলে দাবি করা ওই ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছিল। ঘটনাচক্রে, মণিপুর প্রসঙ্গে নীরব প্রধানমন্ত্রী মোদী এর পরেই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন বৃহস্পতিবার।
সংসদ ভবনে ঢোকার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মণিপুরের ঘটনা যে কোনও সভ্য সমাজের পক্ষে লজ্জার।’’ পাশাপাশি, তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বাংলা, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়ের মতো বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। এর পর থেকেই শুরু হয়েছে দু’পক্ষের চাপানউতর।এ দিনও মণিপুর ইস্যুতে উত্তাল হয়ে ওঠে লোকসভা এবং রাজ্যসভা৷ বিরোধীদের হইহট্টগোলে শেষ পর্যন্ত মুলতবি হয়ে যায় সংসদের দুই কক্ষই৷বিরোধী দলগুলির বিক্ষোভে হাজির হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ তিন মাস ধরে মণিপুর জ্বলছে৷ এ নিয়ে সরকারের কী অবস্থান তা স্পষ্ট করুক৷ মণিপুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেন চুপ? কারণ সরকার মণিপুর নিয়ে আলোচনাই চায় না৷ মণিপুর থেকে নজর ঘোরানোর জন্য এখন বাংলা, বিহার, রাজস্থানে নারী নির্যাতনের কথা তোলা হচ্ছে৷ বাংলায় তো তিন মাস ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে হয় না৷ মণিপুরে কেন বন্ধ রাখতে হচ্ছে? বাংলায় তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক৷ যদি মণিপুরের অবস্থা বাংলার থেকে ভাল হয় তাহলে সেখানে ইন্টারনেট চালু করে দেওয়া হোক৷ ডবল ইঞ্জিনের সরকার শাসিত রাজ্যে তিন মাস ধরে ইন্টারনেট বন্ধ৷ অথচ সিঙ্গল ইঞ্জিনের সরকারের রাজ্যে তা চালু রয়েছে৷’
সিপিএম সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও বলেন, ‘মণিপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে তো অন্য কোনও কিছুরই তুলনা চলে না৷’ অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেন, ‘শুরু থেকে আমরা বলে আসছি যে প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে মণিপুর নিয়ে বিবৃতি দিন৷ মোদিজি সংসদের বাইরে কথা না বলে সংসদে এসে মণিপুর নিয়ে বক্তব রাখুন৷’এ দিকে বিরোধীদের পাল্টা এ দিন সংসদ ভবনের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ এবং রাজস্থানের মতো বিরোধী শাসিত রাজ্যে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন বিজেপি সাংসদরা৷ সবমিলিয়ে মণিপুর ইস্যুতে অচলই রইল সংসদের বাদল অধিবেশন৷
