গ্রেফতার করার দরকার আছে কি অভিষেককে?

নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত কুন্তল ঘোষ দাবি করেছিলেন, অভিষেকের নাম বলতে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থার তরফে। এরপর নিয়োগ মামলায় জড়িয়ে যায় অভিষেকের নাম।নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় আপাতত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নয়। এমনই নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করার দরকার আছে কি না, ইডি-র কাছে তা জানতে চাইল আদালত। সেই সঙ্গে নথিও পেশ করার সুযোগ পেল ইডি। কুন্তল ঘোষের বিতর্কিত মন্তব্যের পরই নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় জড়িয়েছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের করা এফআইআর খারিজ করার আর্জি জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সেই মামলায় হাইকোর্টের নির্দেশ, নিয়োগ মামলায় আগামী সোমবার পর্যন্ত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা যাবে না।

বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের সিঙ্গল বেঞ্চে আগামী সোমবার ফের এই মামলার শুনানি হবে।এর মধ্যেই গত ৮ জুন অভিষেকের কাছে নিয়োগ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইডির চিঠি আসে। রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে মঙ্গলবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে (যেখানে ইডির দফতর) অভিষেককে তলব করা হয় ১৩ জুন। কিন্তু অভিষেক জানিয়ে দেন, তিনি পঞ্চায়েত ভোট পর্ব মেটার আগে কোনও রকম হাজিরা দিতে পারবেন না। ভোটের সময় তাঁর অনেক কাজ। সেই কাজ মিটলে ৮ জুলাইয়ের পর তিনি দেখতে পারেন। অভিষেকের কথায়, ‘‘আমার সৌজন্য আমার দুর্বলতা নয়। আপনি যখন ডাকবেন, তখনই আমাকে যেতে হবে তা নয়। পঞ্চায়েত ভোটের আগে ইডির দফতরে গিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা অপচয় করার মতো সময় আমার হাতে নেই। ৮ জুলাই পঞ্চায়েত ভোট। তার পরে আপনারা যখন ডাকবেন, তখনই যাব।’’ ইতিমধ্যেই পঞ্চায়েত ভোট অতিক্রান্ত। ১১ জুলাই ভোটের গণনা। তার পর অভিষেককে ডাকা হবে কি না, তা অবশ্য সময়ই বলবে।নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সিবিআই-এর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন অভিষেক। পরে তাঁকে তলব করেছিল ইডি-ও। তবে ইডি দফতরে হাজিরা দেননি তিনি। এদিন বিচারপতি বলেন, আমরা ইডি-র কাছে জানতে চাই অভিষেককে গ্রেফতার করার দরকার আছে কি না। তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার দরকার আছে কি না, জানতে চাই। আগামী সোমবার ইডি-কে অভিষেক সংক্রান্ত যাবতীয় নথি ও তথ্য আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিন ইডি-র তরফে আইনজীবী জানান, শিক্ষক নিয়োগের মামলায় ইডি অভিষেককে ফের করে তলব করার পরিকল্পনা করেছে, সেটা এখনও বলা যাচ্ছে না। ইডি আরও জানিয়েছে, গত ১৪ জুন ডাকা হয়েছিল অভিষেককে। কিন্তু তিনি ভোটে ব্যস্ততার কথা বলে হাজিরা দেননি। অভিষেকের বিরুদ্ধে ইডি-র কাছে পর্যাপ্ত নথি আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি

গত ৩০ মার্চ অভিষেককে নিয়ে ওই দাবি করেছিলেন কুন্তল। ঘটনাচক্রে, তার ঠিক আগের দিনই অর্থাৎ ২৯ মার্চ কলকাতার শহিদ মিনারে ছাত্র এবং যুব তৃণমূলের এক সমাবেশে অভিষেক দাবি করেছিলেন, মদন মিত্র এবং কুণাল ঘোষের মতো নেতারা যখন কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে ছিলেন, তখন তাঁদেরকেও অভিষেকের নাম নেওয়ার জন্য ‘চাপ’ দেওয়া হয়েছিল। কুন্তলের আদালতে হাজিরা ছিল পরের দিনই। আদালতে ঢোকার মুখেই তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলে যান, নিয়োগ মামলায় অভিষেকের নাম বলানোর চেষ্টা হচ্ছে তাঁকে দিয়ে। সিবিআই এবং ইডিই তাঁর ওপর এর জন্য ‘চাপ’ দিচ্ছে বলে দাবি করেন কুন্তল।
মামলা সুপ্রিম কোর্টে যায়। তার পর আবার হাই কোর্টে ফিরে আসে। বদলায় বিচারপতির এজলাস। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চ থেকে মামলাটি সরানো হয় বিচারপতি সিন্হার বেঞ্চে। বৃহস্পতিবার সেই মামলারই রায়দান ছিল। বিচারপতি সিন্হা এই মামলায় বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশকে বজায় রাখার পাশাপাশি অভিষেক এবং কুন্তল দু’জনকেই মাথাপিছু ২৫ লক্ষ টাকা করে জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দু’টি ঘটনা কাকতালীয় হতে পারে না বলে এজলাসে মন্তব্য করেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দু’জনের একই ধরনের দাবি কাকতালীয় হতে পারে না। এই মামলায় তদন্ত হওয়া দরকার। দরকারে অভিষেককেও জেরা করতে পারবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি এবং সিবিআই।’’
অভিষেক অবশ্য বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন।

সেই মামলার শুনানিতে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের মামলা বিচারের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন অভিষেকের আইনজীবী। যার জেরে বিচারপতির এজলাস থেকে সরে নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা। যদিও অভিষেককে ইডি-সিবিআইয়ের জেরা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয় না। সেই মামলা সুপ্রিম কোর্ট আবার হাই কোর্টেই ফিরিয়ে দেয়। তবে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের বদলে অন্য বিচারপতির বেঞ্চে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় হাই কোর্টকে। কুন্তলের চিঠি সংক্রান্ত অভিষেকের মামলাটি এর পর যায় বিচারপতি অমৃতা সিংহের বেঞ্চে। তবে তাতেও সুরাহা হয়নি অভিষেকের। তিনি ইডি এবং সিবিআইয়ের জেরার হাত থেকে কোনওরকম রক্ষাকবচ পাননি।

বিচারপতি সিংহ এই সংক্রান্ত মামলায় বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশই বহাল রাখেন। কুন্তলের চিঠি সংক্রান্ত মামলায় বিচারপতি সিংহের কাছে অভিষেকের আইনজীবী হাই কোর্টের পুরনো নির্দেশ পুনর্বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তৃণমূল নেতাকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ দেওয়ার আর্জিও জানিয়েছিলেন তিনি। বিচারপতি অমৃতা সিংহ বলে দেন, “আদালতের দরজা ২৪ ঘণ্টা ৭ দিন খোলা থাকবে। প্রয়োজন মনে করলে যখন খুশি আসবেন। কিন্তু কোনও রক্ষাকবচ নয়।”
গত ১৮ মে এই মামলার অন্য আবেদনটির শুনানি ছিল। যেখানে অভিষেক চেয়েছিলেন, তাঁকে ইডি, সিবিআই জেরা করতে পারবে বলে যে নির্দেশ আদালত দিয়েছিল, তা পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহার করা হোক। কিন্তু অভিষেকের এই আবেদনটিও খারিজ হয়ে যায়। বিচারপতি সিংহের বেঞ্চ বলে, অভিষেকের মামলা ধোপে টেকেনি। যে আবেদন অভিষেক করেছিলেন, তার কোনও সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই মর্মে অভিষেক এবং কুন্তল দু’জনকেই ২৫ লক্ষ টাকা করে মোট ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশও দেন বিচারপতি। পরে ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান অভিষেক। শীর্ষ আদালতে জরিমানার উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। কিন্তু সিবিআই এবং ইডির জেরায় কোনও বাধা দেয়নি।

উল্লেখ্য, পঞ্চায়েত ভোট ঘোষণার আগে রাজ্যের জেলায় জেলায় নবজোয়ার যাত্রা কর্মসূচি চালাচ্ছিলেন অভিষেক। ৫৫ দিন ধরে চলে সেই কর্মসূচি। এর মধ্যে কুন্তলের চিঠি সংক্রান্ত মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অভিষেককে ডেকে পাঠায় সিবিআই। কলকাতার নিজাম প্যালেসে তাঁকে প্রায় ৯ ঘণ্টা ৪০ মিনিট জিজ্ঞাসাবাদ করেন কেন্দ্রীয় এজেন্সির আধিকারিকরা। যদিও এই দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিষেক বেরিয়ে এসে বলেন, ‘‘শুধু শুধুই আমায় ডেকে পাঠানো হচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাবাদের নেট রেজাল্ট জিরো।’’
এর পরেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে অভিষেকের আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি বলেছিলেন, বার বার অভিষেককে ডেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করার নামে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি এ-ও বলেছিলেন, অভিষেক আশঙ্কা করছেন, পরের বার তাঁকে গ্রেফতার করা হবে। পঞ্চায়েত ভোটের প্রচার চলাকালীন তাঁকে সমন পাঠিয়ে তলব করা হয়েছে। তিনি তাতে সাড়া দিয়ে জেরায়

যোগ দেওয়ার পরও তাঁকে হেনস্তা করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য তার পরও জেরার পক্ষেই রায় দেয়।
নিয়োগ মামলায় সুপ্রিম কোর্টে স্বস্তি পাননি অভিষেক। এরপর ইডি-র করা এফআইআর খারিজ করার আর্জি জানান তিনি। শীর্ষ আদালত কোনও রক্ষাকবচ দেয়নি তাঁকে। তবে নির্দেশ ছিল, প্রয়োজনে মামলা দায়ের করতে পারেন অভিষেক। হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহা ইডি-কে আগেই এফআইআর করে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর এফআইআর করে ইডি।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত কুন্তল ঘোষ দাবি করেছিলেন, অভিষেকের নাম বলতে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থার তরফে। ওই বক্তব্যের ঠিক একদিন আগে দলীয় সভা থেকে অভিষেক বলেছিলেন, সারদায় অভিযুক্তদেরকে তাঁর নাম বলানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন ওঠে, অভিষেকের মন্তব্যের ছায়া কেন কুন্তলের বক্তব্যে? সেই সংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্য়ায় নির্দেশ দিয়েছিলেন, অভিষেককে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে ইডি ও সিবিআই। ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে বেঞ্চ বদল হয়। আপাতত মামলাটি চলছে বিচারপতি সিনহার বেঞ্চে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *