চমক ডিমের খোসার – রয়েছে বৈচিত্র্যময় উপযোগিতা আর বহুমুখী ব্যবহার

নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ প্রোটিন, আয়রন এবং অনেক খনিজ এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ একটি ডিম আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন উপকারী, এর খোসাও অনেক দিক থেকে উপকারী। আসলে, আপনি যে ডিমের খোসা ফেলে দেন তার সাহায্যে আপনি আপনার চারপাশের অনেক কাজ সহজ করতে পারেন এবং অপ্রয়োজনীয় খরচও কমাতে পারেন। আমরা আপনাকে বলি যে ডিমের খোসায় ৯৫ শতাংশ ক্যালসিয়াম কার্বনেট থাকে। সারা বিশ্বে বছরে প্রায় ৮০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ডিম উৎপাদিত হয়। ডিম খাওয়ার ব্যাপারে জাপানিরা সবচেয়ে এগিয়ে আছে। তারা প্রত্যেকে গড়ে প্রতিবছর ৩২০টি ডিম খেয়ে থাকে। আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে এই সংখ্যা সে তুলনায় অনেক কম, প্রায় ১০৩টি। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে অন্য যেকোনো প্রাণীজ আমিষের চেয়ে ডিমের আধিপত্য বেশি ঘরে ঘরে। দামে কম, বেশি পুষ্টিকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মহামারির সময়ে প্রোটিন বুস্ট আপের প্রধান উপায়ই হচ্ছে ডিম খাওয়া। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এই এত এত ডিমের কত খোসা আমরা ফেলে দিচ্ছি প্রতিদিন! অথচ ডিমের খোসার রয়েছে বৈচিত্র্যময় উপযোগিতা আর বহুমুখী ব্যবহার।ডিমের খোসা ক্যালসিয়ামের এক অফুরন্ত খনি

আমাদের দেশে ছোট–বড় সবার প্রায়ই ক্যালসিয়ামের অভাবজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধি হয়। বিশেষত গিঁটেবাত, হাড়ের ক্ষয়, হাড় ফাঁপা হয়ে যাওয়া, বিভিন্ন ব্যথা–বেদনা, ভঙ্গুর দাঁত ও নখ ইত্যাদি রোগে দেশের শিশু ও বয়স্ক জনগণের একটি বিরাট অংশ ভুগে থাকে। অথচ অত্যন্ত কম খরচে ডিমের খোসা থেকে তৈরি ক্যালসিয়াম পাউডার আমাদের দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে মেটাতে পারে। সঠিকভাবে প্রস্তুতকৃত এক চা–চামচ ডিমের খোসার চূর্ণতে আছে ৮০০-১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। আর একজন সুস্থ–স্বাভাবিক মানুষের দিনে ৫০০ থেকে ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়ের জন্য এই প্রয়োজনের পরিমাণ আরও বেশি। অথচ ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস হিসেবে জনপ্রিয় দুধে এই উপাদান থাকে প্রতি এক কাপে মাত্র ৩০০-৪০০ মিলিগ্রাম।ডিমের খোসার চূর্ণ গ্রহণের উপকারিতা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমের খোসায় ক্যালসিয়াম মূলত ক্যালসিয়াম কার্বনেট হিসেবে থাকে, যা কিনা আমাদের হাড় ও দাঁতের মূল উপাদানের সঙ্গে একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তা সহজে ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই শরীরে শোষিত হয়ে আমাদের উপকার করতে পারে। সারা বিশ্বে হাড়ের ব্যথা, ক্ষয়, জোড়ের বিকৃতিতে কষ্ট পাচ্ছেন যাঁরা, এমনকি হাড়ের কার্টিলেজ শুকিয়ে যেতে থাকা রোগীরাও ডিমের খোসার চূর্ণ সেবন করে সুস্থ জীবন যাপন করছেন। এ ছাড়া পেশির সংকোচন-প্রসারণ, স্নায়ুতন্ত্র ভালো রাখা ও শরীরের তবে অন্য যেকোনো ক্যালসিয়াম বড়ির মতোই অনেকের ডিমের খোসার চূর্ণ বেশি সেবন করলে হজমে কিছু সমস্যা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সহনশীলতা অনুযায়ী খাওয়া উচিত এই পাউডার।
বাড়িতেই তৈরি করে নিন ডিমের খোসার চূর্ণ

প্রথমেই ভালো, রোগমুক্ত, অর্গানিক, তাজা ডিমের খোসা নিয়ে তার পর্দা, আঠাসহ আলগা ময়লা ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যেন ডিমের খোসা খুব পাতলা না হয়। এবার জীবাণুমুক্ত করার জন্য ফুটন্ত পানিতে খোসাগুলো ভালোভাবে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। খোসাগুলো তুলে, পানি ঝরিয়ে ও শুকিয়ে নিয়ে বেকিং শিটে করে ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় ১০ মিনিট বেক করে নিতে হবে, যেন সম্পূর্ণ জলীয় অংশ চলে যায়। এবার ডিমের খোসাগুলো কফি গ্রাইন্ডার বা চিনি গুঁড়া করার ব্লেন্ডারে মিহি গুঁড়া করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে ডিমের খোসাচূর্ণ। একটি শুকনা বয়ামে ভরে রাখলে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিদিন এক চামচ পাউডার পছন্দমতো স্যুপ, তরল পানীয়, শরবত, স্মুদি ইত্যাদির সঙ্গে গুলে খাওয়া যায়। বিভিন্ন হেলথ ফুড স্টোরে এগ শেল ক্যালসিয়াম পাউডার কিনতেও পাওয়া যায়।
কোষগঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে ক্যালসিয়ামের বিকল্প নেই।পশু ও পাখির খাদ্যে ডিমের খোসা
শুধু মানুষের নয়, পশু ও পাখির খাদ্যকেও ক্যালসিয়ামের পরিপূর্ণতা দিতে পারে ডিমের খোসার চূর্ণ। এ ছাড়া হাঁস–মুরগি নিজে নিজেই ঠুকরে ডিমের খোসা খেতে পছন্দ করে। বাড়ির বিড়াল, কুকুর, খরগোশ বা পোষা পাখির জন্য ডিমের খোসার চূর্ণ দিয়ে মিনারেল ব্লক বানিয়ে দেওয়া যায়। গবাদিপশুর খাবারেও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাতে পারে ডিমের খোসা।
বাগানে ডিমের খোসা ব্যবহার

বহু যুগ ধরেই বিশ্বের সব দেশে গাছের নাইট্রেট সারের সহায়ক হিসেবে প্রোটিনের চাহিদা মিটিয়ে আসছে ডিমের খোসা। অকালে কুঁড়ি, ফুল, ফল ঝরে পড়া রোগে ও অপুষ্টির জন্য বাগানে গাছের গোড়ায় ডিমের খোসা দেন সবাই। ডিমের খোসা টুকরা করে ছড়িয়ে রাখলে পাতা খেয়ে ফেলা ছাড়া ইদানীং ডিমের খোসায় করে এক অভিনব বীজতলার প্রচলন হয়েছে সারা বিশ্বে। ডিমের বাক্সেই ডিমের খোলায় সার মেশানো অল্প ভেজা মাটি দিয়ে বীজ বপন করা হয় এই ব্যবস্থায়। এ ক্ষেত্রে গজিয়ে ওঠা চারা, ডিমের খোসাসহই রোপণ করে দেওয়া যায়। এতে স্থানান্তরের সময়ে নতুন চারার কোনোরূপ ক্ষতি হয় না, বরং ডিমের খোসার পুষ্টি বাড়তি পাওনা হিসেবে থাকে। ডিমের খোসা গাছের গোড়ায় সার হিসেবে ব্যবহার করলে গাছ অনেক উপকার পাবেন এবং দ্রুত সেই গাছটি বৃদ্ধি পাবে। শুধু তাই নয়, গাছপালায়ও প্রচুর পরিমাণে ফুল আসতে শুরু করবে। ত্বকের যত্নে ডিমের খোসাও অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। যদি আপনার মুখ থেকে উজ্জ্বলতা চলে যায়, তাহলে ডিমের খোসা ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিন। এবার এতে মধু মিশিয়ে মুখে স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করুন। ফেস মাস্ক হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন। এ জন্য ডিমের ফেস মাস্ক হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন।

এ জন্য ডিমের খোসা পিষে দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। ডিমের খোসার সাহায্যেও আপনি আপনার হলুদ দাঁত সাদা করতে পারেন। আপনি এক চা চামচ ডিমের খোসার গুঁড়ার মধ্যে এক চিমটি বেকিং সোডা দিন। এবার এতে নারকেল তেল মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এবার পেস্ট হিসেবে ব্যবহার করুন। দাঁতের উজ্জ্বলতাও ফিরে আসবে।
সারা বিশ্বে প্রতিদিন যে বিশালসংখ্যক ডিম আমরা খাই, তার খোসাগুলো ফেলে না দিয়ে এসব বিকল্প ব্যবহার করতে পারলে তা আমাদের জন্য খুবই উপকারে আসবে। বিকল্প খাদ্য উৎস, পুনর্চক্রায়ন বা রিসাইক্লিং, ময়লা–আবর্জনার স্তূপ ও পরিবেশদূষণ কমিয়ে আনা, যে আঙ্গিক থেকেই দেখি না কেন, সময় এসেছে ডিমের খোসা ময়লার ভাগাড়ে ফেলার আগে একবার ভেবে দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *