নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ “ঝাঁট দিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়” বেলুড় মঠের অষ্টম অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রীমৎ স্বামী বিশুদ্ধানন্দজী মহারাজ। তিনি ছিলেন শ্রীশ্রীমা সারদার দক্ষিত, গত শতাব্দীর প্রথমেই।
তখন দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত ছিল। নজরে পড়লো, বৃদ্ধ মালী একই রাস্তা প্রত্যেক দিন খুব যত্নে নিখুঁত ভাবে পরিস্কার করে। জিজ্ঞেস করে কারণ জানতে পারলেন।
মালী বলল, এক রাত ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি পঞ্চমুণ্ডির দিকে উজ্জ্বল আলো। কৌতুহল হতে গিয়ে দেখি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গভীর ধ্যানে, আর গা থেকে সেই জ্যোতি বেরোচ্ছে। ভয়ে ঘরে চলে এলুম।
পর দিন সকালে ঠাকুরের সাথে দেখা হতেই পায়ে পড়ে খুব কাঁদতে লাগলুম। তিনি বললেন, ‘কাল রাতে যা দেখেছ, তাঁর ধ্যান করবে।’ আর বললেন, প্রচুর ভক্ত এই জায়গায় আসবে। রাস্তাটা তুমি মনে করে রোজ পরিস্কার করতে ভুলোনা যেন। তাই পরিস্কার করি, বলল মালী।
কোনও কাজই তুচ্ছ নয়। যেই আশ্রমেই থেকেছি, প্রত্যেক দিন ঝাঁট দিয়ে আনন্দ পেয়েছি। কখনও দিনে কয়েকবার, পাখি আর বানরের করা আবর্জনা সাফ করতে। ঝাঁট দেয়া একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। হাঁটতে বসতে, গাইতে যেমন জপ চলে, ঝাঁটা হাতেও তাই। যত হাঁটি তত আনন্দ, যত ঝাঁট দিই ততই আনন্দ।
ঠাকুরের পার্ষদ স্বামী শিবানন্দ বলতেন এসব জায়গা দিয়ে ঠাকুর হাঁটেন, ঝাঁট দিতে হয়।
“পরিব্রাজক বিবাকান্দ”
“জাপান ভ্রমণ”
তার শিকাগো যাবার পথে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে জাপান ভ্রমণ করেন। প্রথমে তিনি বন্দর নগরী নাগাসাকি পৌঁছান এবং তারপর কোবে যাবার জন্য একটি স্টীমারে চড়েন। এখান থেকে তিনি স্থলপথে তিন বড়ো শহর ওসাকা, কিয়োটো এবং টোকিও ভ্রমণ করে ইয়োকোহামা যান। তিনি জাপানীদের “পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জনগণের অন্যতম” বলে অভিহিত করেন এবং শুধুমাত্র তাদের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের পরিচ্ছন্নতার দ্বারাই চমৎকৃত হননি বরং তাদের কর্মচাঞ্চল্য, মনোভাব ও ভঙ্গি দেখেও চমৎকৃত হন। যাদের সকল কিছু্কেই তার মনে হয়েছিল “চিত্রবৎ বা ছবির মতো”।[৯৬]
এটি ছিল জাপানে দ্রুত সামরিক সংখ্যা/শক্তি বৃদ্ধির সময়কাল – চিন-জাপান যুদ্ধ এবং রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের পূর্বসূচক। এ সকল প্রস্ত্তুতি বিবেকানন্দের মনোযোগ এড়ায়নি, যিনি লিখেছিলেন -“জাপানিরা এখন মনে হয় বর্তমান সময়ের প্রয়োজনানুসারে নিজেদের সম্পূর্ণ জাগিয়ে তুলেছে। তারা এখন তাদের নিজেদের কর্মকর্তাদের আবিষ্কৃত ও অতুলনীয় বলে কথিত বন্দুক/অস্ত্রসমূহ দ্বারা সজ্জিত এক সম্পূর্ণ সংগঠিত সামরিক বাহিনী। তাছাড়া তারা তাদের নৌ-বাহিনীকে অবিরামভাবে বর্ধিত করছে।” তার পর্যবেক্ষণকৃত শিল্পে অগ্রগতি সম্পর্কে, “দিয়াশলাই কারখানাগুলো একেবারে দেখার মত এবং তারা যা চায় তার সকল কিছুই তাদের নিজেদের দেশে তৈরি করতে আগ্রহী।”[৯৬]
জাপানের দ্রুত অগ্রগতির বিপরীতে ভারতের পরিস্থিতি তুলনা করে তিনি তাগিদ দেন তার দেশের মানুষকে – “কুসংস্কার এবং নিপীড়নের শতাব্দীর সন্তান-সন্ততিদের” – তাদের সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিদেশের দিকে তাকাতে –
“ শুধু আমি চাই যে আমাদের যুবকেরা প্রতি বছর জাপান এবং চিন ভ্রমণ করুক। বিশেষ করে জাপানিদের নিকট ভারত তারপরও এমন এক স্বপ্নরাজ্য যার সবকিছুই উচ্চস্তরের এবং ভালো। এবং তোমরা, তোমরা কী?…তোমাদের সারা জীবন বাজে বকিতেছ, অনর্থক প্রলাপকারীরা, তোমরা কী? এসো, এ সকল মানুষকে দেখো এবং যাও আর লজ্জায় তোমাদের মুখ ঢাকো। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন জাতি, তোমরা তোমাদের প্রাসাদ হারাবে যদি তোমরা বাইরে আসো! শত শত বছর ধরে তোমাদের মাথার উপর দানা বাঁধা কুসংস্কারের ক্রমবর্ধমান বোঝা নিয়ে বসে আছো, শত শত বছর ধরে এ খাবার সে খাবারের স্পর্শযোগ্যতা বা স্পর্শ-অযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে তোমাদের সকল শক্তি ক্ষয় করছ, যুগ যুগ ধরে অবিরাম সামাজিক পীড়নের দ্বারা তোমাদের সকল মানবিকতা নিষ্পেষিত – তোমরা কী? আর তোমরা এখন কী করছ?…তোমাদের হাতে বই নিয়ে সমুদ্রতীরে ভ্রমণ করছ – ইউরোপিয়ান মস্তিষ্ক-কর্মের অজীর্ণ পথভ্রষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ পুনরাবৃত্তি করছ, আর ত্রিশ রুপির কেরানির চাকরির জন্য সমস্ত আত্মা অবনত, অথবা বড়োজোর একজন উকিল হওয়া – নবীন ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার শিখর – আর প্রত্যেক ছাত্রের সঙ্গ তার পায়ে পায়ে ঘুরে একদল ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়ের দল রুটি চাচ্ছে! তোমাদের, বইগুলোর, গাউনের, বিশ্ববিদ্যালয় ডিপ্লোমাগুলোর আর সব কিছুর ডোবার জন্য সমুদ্রে যথেষ্ট জল কী নেই?[৯৬]
”
প্রথম পাশ্চাত্য ভ্রমণ
চিন, কানাডা হয়ে তিনি আমেরিকার শিকাগো পৌঁছান ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে।[৯৭] কিন্তু চিকাগো শহরে পৌঁছে উনি মূলত দুটি সমস্যায় পড়লেন — এক, তিনি বুঝলেন যে মহাসভা শুরু হতে তখনো প্রায় দেড় মাস বাকি, এবং কোনো খ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রশংসাপত্র বা পরিচিতিপত্র ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না, যা তার কাছে ছিল না। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের সংস্পর্শে এলেন।[৯৮] তাকে হার্ভার্ডে আমন্ত্রণ জানানোর পর এবং ধর্মসভায় বক্তৃতাদানে তার প্রশংসাপত্র না থাকা প্রসঙ্গে রাইটের উদ্ধৃতি, “আপনার কাছে প্রশংসাপত্র চাওয়াটা হচ্ছে স্বর্গে সূর্যের আলো দেওয়ার অধিকার চাওয়ার মতো অবস্থা।” রাইট তখন প্রতিনিধিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিকট এক চিঠিতে লিখলেন, “আমাদের সকল অধ্যাপক একত্রে যতটা শিক্ষিত ইনি তাদের থেকেও বেশি শিক্ষিত।” অধ্যাপকের ব্যাপারে বিবেকানন্দ নিজে লেখেন, “তিনি আমাকে ধর্মসভায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নির্বন্ধ সহকারে বোঝান, যেটি তিনি মনে করেছিলেন জাতির নিকট তাঁকে একটি পরিচিতি দেবে।”[৯৯]
