গৌতম বিশ্বাস,নিউজ ইউএপি ডিজিটাল ডেস্কঃ
যদি শিক্ষা বলিতে শধু, কতকগুলি বিষয় জানা বুঝায়, তবে লাইব্রেরিগুলিই তো জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, অভিধানসমুহই তো ঋষি। সুতরাং আদর্শ এই হওয়া উচিত যে, আমাদের আধ্যাত্মিক ও লৌকিক সর্বপ্রকার শিক্ষা নিজেদের হাতে লইতে হইবে এবং যতদূর সম্ভব জাতীয়ভাবে ঐ শিক্ষা দিতে হইবে । অবশ্য ইহা একটি গুরুতর ব্যাপার—কঠিন সমস্যা। জানি না, ইহা কখন কার্যে পরিণত হইবে কিনা । কিন্তু, আমাদিগকে কাজ আরম্ভ করিয়া দিতে হইবে ৷
ইহা অতি প্রকাণ্ড ব্যাপার বোধ হইতে পারে, কিন্তু, ইহাই প্রয়োজন । তোমরা বলিতে পারো, টাকা কোথায় ? টাকার প্রয়োজন নাই; টাকায় কি হইবে? গত বারো বৎসর যাবৎ কাল কি খাইব, তাহার ঠিক ছিল না, কিন্তু, আমি জানিতাম—অর্থ এবং আমার যাহা কিছু আবশ্যক, সব আসিবেই আসিবে, কারণ অর্থাদি আমার দাস, আমি তো ঐগুলির দাস নই। আমি বলিতেছি, অর্থ ও অন্য সব নিশ্চয় আসিবে। জিজ্ঞাসা করি, মানুষ কোথায় ? আমাদের অবস্থা কি দাঁড়াইয়াছে, তাহা তোমাদিগকে পর্বেই বলিয়াছি ;—মানুষ কোথায় ?
তোমরা আধ মাইল পথ হাঁটিতে পার না, হনুমানের মতো সমুদ্র পার হইতে চাহিতেছ । তাহা কখনই হইতে পারে না। সকলেই যোগী হইতে চায়, সকলেই ধ্যান করিতে অগ্রসর। তাহা হইতেই পারে না। সারাদিন সংসারের সঙ্গে—কর্মকাণ্ডে মিশিয়া সন্ধ্যাবেলায় খানিকটা বসিয়া নাক টিপিলে কি হইবে? এ কি এতই সোজা ব্যাপার নাকি—তিনবার নাক টিপিয়াছ, আর অমনি ঋষিগণ উড়িয়া আসিবেন । এ কি তামাশা? এসব অর্থহীন বাজে কথা আবশ্যক – চিত্তশুদ্ধি। কিরূপে এই চিত্ত— শুদ্ধি হইবে? প্রথম পূজা বিরাটের পূজা; তোমার সম্মুখে—তোমার চারিদিকে – যাঁহারা রহিয়াছেন, তাঁহাদের পূজা ; ইহাদের পূজো করিতে হইবে – সেবা নহে; ‘সেবা’ বলিলে আমার অভিপ্রেত ভাবটি ঠিক বুঝাইবে না, ‘পূজা’ শব্দেই ঐ ভাবটি ঠিক প্রকাশ… করা যায়। এই-সব মানুষ ও পশু – ইহারাই তোমার ঈশ্বর, আর তোমার স্বদেশবাসি – গণই তোমার প্রথম উপাস্য। পরস্পরের প্রতি দ্বেষ-হিংসা পরিত্যাগ করিয়া ও পরস্পর বিবাদ না করিয়া প্রথমেই এই স্বদেশবাসিগণের পূজা করিতে হইবে। তোমরা নিজেদের ঘোর কুকর্মের ফলে কষ্ট পাইতেছ, এত কষ্টেও তোমরা চোখ খুলিবে না?
তোমরা এখন যে- শিক্ষা পাইতেছ, তাহার কতকগুলি গুণ আছে বটে, কিন্তু, আবার কতকগুলি বিশেষ দোষও আছে, আর দোষগুলি এত বেশী যে, গূণভাগ নগণ্য হইয়া যায় প্রথমতঃ ঐ শিক্ষায় মানষ তৈরী হয় না- ঐ শিক্ষা সম্পূর্ণ নাস্তিভাবপূর্ণ । এইরূপে শিক্ষায় অথবা অন্য যে-কোন নেতিমূলক শিক্ষায় সব ভাঙিয়া-চারিয়া যায়—মৃত্যু অপেক্ষাও তাহা ভয়ানক ৷ বালক স্কুলে গিয়া প্রথমেই শিখিল—তাহার বাপ একটা মূর্খ, দ্বিতীয়তঃ তাহার পিতামহ একটা পাগল, তৃতীয়তঃ প্রাচীন আর্যগণ সব ভণ্ড, আর চতুর্থতঃ শাস্ত্র সব মিথ্যা। ষোল বৎসর বয়স হইবার পর্বেই সে একটা প্রাণহীন, মেরুদণ্ডহীন ‘না’-এর সমষ্টি হইয়া দাঁড়ায়। ইহার ফল এই দাঁড়াইয়াছে যে, পঞ্চাশ বৎসরের এইরূপে শিক্ষায় ভারতের তিনটি প্রেসিডেন্সির ভিতরে মৌলিক চিন্তাযুক্ত একটি মানুষেও পাওয়া যায় না। যিনি মৌলিক ভাবপুর্ণ, তিনি অন্যত্র শিক্ষালাভ করিয়াছেন —এদেশে নয় ; অথবা তিনি নিজেকে কুসংস্কার হইতে মুক্ত করিবার জন্য প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করিয়াছেন। মাথায় কতকগুলি তথ্য ঢুকানো হইল, সারা- জীবন হজম হইল না, অসম্বদ্ধভাবে সেগুলি মাথায় ঘুরিতে লাগিল—ইহাকে শিক্ষা বলে না। বিভিন্ন ভাবকে এমনভাবে নিজের করিয়া লইতে হইবে, যাহাতে আমাদের জীবন গঠিত হয়, যাহাতে মানুষ তৈরী হয়, চরিত্র গঠিত হয়। যদি তোমরা পাঁচটি ভাব হজম করিয়া জীবন ও চরিত্র ঐভাবে গঠিত করিতে পারো, তবে যে-ব্যক্তি একটি গ্রন্থা- গারের সবগুলি পুস্তক মুখস্থ করিয়াছে, তাহার অপেক্ষা তোমার অধিক শিক্ষা হইয়াছে বলিতে হইবে। ‘যথা খরশ্চন্দনভারবাহী ভারস্য বেত্তা ন তু চন্দনস্য।’- চন্দনভারবাহী গদর্ভ যেমন উহার ভারই বুঝিতে পারে, অন্যান্য গুণে বুঝিতে পারে না, ইত্যাদি।
ইহার জন্য আমি চাই কয়েকটি যুবক। বেদ বলিতেছেন, ‘আশিষ্ঠো দ্রঢ়িষ্ঠো বলিষ্ঠো মেধাবী’—আশাপূর্ণ বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা ও মেধাবী যুবকগণই ঈশ্বরলাভ করিবে ৷ তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের পথ নির্ধারণ করিবার এই সময়— যতদিন যৌবনের তেজ রহিয়াছে, যতদিন না তোমরা কর্ম শ্রান্ত হইতেছ, তোমাদের ভিতর যৌবনের নবীনতা ও সতেজ ভাব রহিয়াছে ; কাজে লাগো—এই তো সময়। কারণ নবপ্রস্ফুটিত অস্পৃষ্ট অনাঘ্রাত পুষ্পই কেবল প্রভুর পাদপদ্মে অর্পণের যোগ্য — তিনি… তাহা গ্রহণ করেন । তবে ওঠো ওকালতির চেষ্টা বা বিবাদ-বিসংবাদ প্রভৃতি অপেক্ষা বড় বড় কাজ রহিয়াছে । আয়ু স্বল্প, সতেরাং তোমাদের জাতির কল্যাণের জন্য— সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য আত্মবলিদানই তোমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম ।
অধিচেতনা
