মাতৃভাষা দিবসে ‘বাংলাকে কাজের ভাষা’ করার দাবিতে সরব বাংলা পক্ষ

নিউজ ইউ এ পি ডিজিটাল ডেস্ক, শিলিগুড়ি | ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ :-আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাকে প্রকৃত অর্থে “কাজের ভাষা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে সরব হল বাংলা পক্ষ। ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠনের পক্ষ থেকে পালিত হয় মাতৃভাষা দিবস। পাশাপাশি সপ্তাহজুড়ে পালন করা হয়েছে ‘বাংলা ভাষার অধিকার সপ্তাহ’, যেখানে ভাষার মর্যাদা, প্রশাসনিক স্বীকৃতি এবং দৈনন্দিন ব্যবহারে বাংলার প্রাধান্য নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়।
শিলিগুড়ি থেকে নিউ টাউন, বাঘাযতীন, আসানসোল, বরানগর, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলি, দাসপুর, খড়গপুর, মালদা, হাওড়া, খড়দা ও আলিপুরদুয়ার—রাজ্যের নানা প্রান্তে আয়োজিত কর্মসূচিতে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে শপথ নেওয়া হয় বাংলাকে প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যাঙ্কিং, বাণিজ্য এবং সর্বস্তরের সরকারি-বেসরকারি কাজে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করার।
ব্যাঙ্ক ও প্রশাসনে বাংলার প্রয়োগের দাবি
বেলেঘাটার এক অনুষ্ঠানে বাংলা পক্ষের সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি বলেন, “বাংলার মাটিতে বাংলা ভাষাকেই কাজের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্যাঙ্ক পরিষেবায় বাংলার দাবিতে করা জনস্বার্থ মামলায় হলফনামা দিয়ে বাংলায় পরিষেবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে বহু মানুষ মাতৃভাষায় পরিষেবা পাচ্ছেন না। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আগামিদিনে বৃহত্তর আন্দোলন ও আইনি লড়াই চলবে।”
সংগঠনের বক্তব্য, সংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বহু সরকারি দপ্তর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার সীমিত। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষত প্রবীণ ও গ্রামীণ নাগরিকরা সমস্যায় পড়ছেন। তাই বাংলায় ফর্ম, নোটিশ, গ্রাহক পরিষেবা ও অনলাইন পরিষেবা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।
ভাষা শহিদদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
বরানগরে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর বাংলা পক্ষের সাধারণ সম্পাদক গর্গ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আজকের দিন শুধু উদযাপনের নয়, আজকের দিন নিজের মাটিতে নিজের মাতৃভাষার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার শপথের দিন। বাংলায় কথা বলার জন্য যাঁরা আক্রান্ত বা নিহত হয়েছেন, তাঁদের সকলকে ভাষা শহিদের মর্যাদা দিতে হবে।”
সংগঠনের দাবি, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের বাহক। তাই মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষা করা নাগরিক অধিকারেরই অংশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায় UNESCO-র উদ্যোগে। ১৯৫২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে প্রাণদানকারী ভাষা শহিদদের স্মরণে এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ভাষার মর্যাদা রক্ষার সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করেই আজও বাংলায় ভাষা-অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসে।
বৃহত্তর প্রস্তাব ও দাবি
বাংলা পক্ষের তরফে আরও কয়েকটি প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে—
সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলায় সাইনবোর্ড বাধ্যতামূলক করা
স্কুল-কলেজে বাংলা ভাষা শিক্ষার সুযোগ ও মানোন্নয়ন
আদালত ও প্রশাসনিক স্তরে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলার ব্যবহার বাড়ানো
মাতৃভাষায় পরিষেবা না দিলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ
সংগঠনের মতে, বাংলাকে “কাজের ভাষা” করতে হলে শুধু আবেগ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ জরুরি। মাতৃভাষা দিবসের আবেগকে সামনে রেখে রাজ্যের সর্বস্তরে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও জোরদার হবে বলেই জানিয়েছে বাংলা পক্ষ।
ভাষার অধিকার রক্ষার এই দাবিতে রাজ্যের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষার মর্যাদা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে আগামী দিনেও ধারাবাহিক কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়েছে সংগঠন।