নিউজ ইউ এ পি ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫শে সেপ্টেম্বর,২০২৫ :– আলিপুরদুয়ার : একেই বোধহয় বিবর্তন বলে। আগে ছিল ফ্লেক্স, ব্যানার, ফেস্টুনের মাধ্যমে পুজোর প্রচার। কোন বারোয়ারি পুজোর কী থিম, কী কী আকর্ষণ, সেকথা ছড়িয়ে দিতে হবে না! তারপর এল ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ায় পুজো উদ্যোক্তা ক্লাবগুলির নিজস্ব অ্যাকাউন্ট। তার মাধ্যমে চলত পুজোর প্রচার। এই সবক’টি মাধ্যমই এখনও রয়েছে। তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পদ্ধতি। রিলস আর ভিডিও। আর সেজন্যই কদর বেড়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের।
যেমন ধরা যাক আলিপুরদুয়ার শহরের অরবিন্দনগরে বাসিন্দা ঋষিকেশ সরকারের কথা। শহরের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে পরিচিত মুখ। পুজোর আগে এখন তিনি ভারী ব্যস্ত। বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে ভিডিও বানাচ্ছেন। আর সেসব ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। তাঁর ফলোয়ারদের মধ্যে সেই ভিডিও যত সাড়া ফেলছে, তত সেইসব ক্লাবের প্রতিমা ও মণ্ডপ দর্শনের প্রতি জনগণের আগ্রহ বাড়ছে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাচ্ছে দুর্গাপুজো কমিটিগুলিও। দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কাছে অন্যতম বড় টপিক। এই ভিডিওগুলোর ভিউ ভালো হয়। লাইক শেয়ার হয় প্রচুর। তাই ঋষিকেশদেরও এমন কাজের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। কখনও তাঁরাই বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে এব্যাপারে যোগাযোগ করছেন। আবার কয়েকটি পুজো কমিটি তো কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজনও করেছে। ভালো ভিডিও তৈরি করা হলে সেই ভিডিওকে পুরস্কৃত করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শহরের আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর সোমনাথ ঘোষের বক্তব্য, ‘দুর্গাপুজো নিয়ে আমি নিজেই কিছু ব্লগ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়েছিলাম। এরপর বিভিন্ন পুজো কমিটি যোগাযোগ করতে থাকে তাদের পুজোর প্রস্তুতির ভিডিও করে দেওয়ার জন্য।’
এব্যাপারে মিলন সংঘ ক্লাবের পুজো কমিটির সম্পাদক মৃণাল ঘোষ বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার এখন জরুরি। শহরের যে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আমাদের পরিচিত। সেই সুবাদেই ভিডিও করে তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। গত কয়েক বছর ধরে এমন প্রচারের ভালো প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’
যদিও পুজোমণ্ডপের ভিডিও বানানোর ক্ষেত্রে নাকি সরাসরি কোনও পারিশ্রমিকের বিষয় নেই। এমনটাই বলছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। তবে পুজো উপলক্ষ্যে আরেকরকম ভিডিও বানিয়ে কিন্তু উপার্জন হচ্ছে তাঁদের। কেমন ভিডিও? বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের ডাক পড়ছে। জামাকাপড়, প্রসাধনী, জুতো, গয়নাগাটি ইত্যাদির দোকানের ভিডিও বানিয়ে নিজের প্রোফাইল থেকে পোস্ট করছেন তাঁরা। সেই ভিডিও বা রিলস দেখে দোকানগুলির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। দোকানগুলির বিক্রিবাটাও বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থেই এইসব সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের ‘রিচ’-কে কাজে লাগাচ্ছেন। এই নিয়ে ঋষিকেশ বলছিলেন, ‘অনেকেই যোগাযোগ করছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ভিডিও করে দেওয়ার জন্য।’ একইরকম কথা শোনা গেল শহরের আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর রত্নদীপ চৌধুরীর কাছেও। ওই তরুণের কথায়, ‘কেউ ভিডিও করে প্রচার করতে চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারপর আমরা একটা মিটিং করছি। তাঁদের চাহিদা বুঝে স্ক্রিপ্ট তৈরি করি। সেটা ক্লায়েন্টদের পছন্দ হলে ভিডিও শুট করা হয়।’
বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্যালন থেকেও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এই ধরনের প্রচার করার জন্য। বিভিন্ন বুটিক থেকে যে এগজিবিশন করা হচ্ছে, সেখানেও ডাক পড়ছে এমন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের। শহরের এক কাপড় ব্যবসায়ী আদিত্য কুমার বলেন, ‘দুর্গাপুজোর আগে একটা বড় বিক্রি হয়। সেটার জন্য তো প্রচার করতেই হয়। আগে যেমন মাইকিং, পোস্টার এই ধরনের প্রচার ছিল। এখন সেগুলোর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিজিটাল প্রচার দরকার। সে কারণেই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রয়োজন হয়।’
পুজো উদ্বোধনে টেক্কা দিচ্ছে তৃণমূল ,
কোচবিহার : বিধানসভা নির্বাচনের আগে পুজোকে জনসংযোগের অন্যতম ‘প্ল্যাটফর্ম’ বানাতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলি। তাতে অবশ্য শাসকদলের তুলনায় একেবারেই পিছিয়ে পড়েছে পদ্ম শিবির। প্রায় প্রতিটি পুজোর উদ্বোধনেই তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিজেপির বিধায়ক বা নেতাদের সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। ‘সবেধন নীলমণি’ হিসেবে বৃহস্পতিবার কোচবিহার শহরের একটি পুজোর উদ্বোধন করার কথা রয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের। কিন্তু তা নিয়েও জলঘোলা শুরু হয়েছে। ফলে পুজোকে কেন্দ্র করে বিজেপির জনসংযোগের সুযোগ হাতছাড়া হল বলেই মনে করছেন অনেকে। ভোটের আগে পুজোকেন্দ্রিক জনসংযোগ রাজনৈতিক দলগুলির কাছে একটি বড় সুযোগ। তৃণমূল পরিকল্পনামাফিক সেই সুযোগকে কাজে লাগালেও বিজেপি সেই ফায়দা তুলতে পারছে না।
ভার্চুয়ালি উদ্বোধনের প্রবণতা আগে না থাকলেও শেষ কয়েকবছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলার অধিকাংশ বিগ বাজেটের পুজোর ভার্চুয়াল উদ্বোধন করছেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই অনুষ্ঠানে প্রশাসনের কর্তাদের পাশাপাশি শাসকদলের নেতাদের ভিড় থাকছে। সেই সুযোগে কৌশলে জনসংযোগ সেরে নিচ্ছেন ঘাসফুলের নেতারা। পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী উদয়ন গুহ, তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক, পুরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, এনবিএসটিসির চেয়ারম্যান পার্থপ্রতিম রায়ের নামই বেশি দেখা যাচ্ছে। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে বহু পুজোর উদ্বোধনে দেখা যেত। এবার কোচবিহারে কোনও পুজোর উদ্বোধনেই তাঁকে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, দিনহাটার পুজোগুলি কার্যত উদয়ন গুহর নিয়ন্ত্রণেই থাকে। একাধিক পুজো কমিটিতেও তিনি রয়েছেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনিও জনসংযোগ সারছেন। উদয়নের কথায়, ‘রাজনীতির কোনও বিষয় নেই। আমরা সকলেই পুজোর আনন্দে মেতেছি।’
কোচবিহারে একটি পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর পুরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেছেন, ‘আমাদের সবাই আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাই এসেছি। তাছাড়া আমরা সারাবছরই মানুষের সঙ্গে থাকি। বিজেপির জনপ্রতিনিধিরা মানুষের সঙ্গে মেশেন না। তাই তাঁরা ডাকও পান না।’
পুজো প্যান্ডেলগুলিতে শাসকদলের নেতাদের যখন আনাগোনা লেগেই রয়েছে, তখন পদ্ম শিবিরকে জনসংযোগে দেখা যায়নি। তবে বিজেপি অবশ্য অভিযোগ করেছে, এর পেছনে প্রশাসন ও তৃণমূলের হাত রয়েছে। বিজেপির কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক নিখিলরঞ্জন দে’র বক্তব্য, ‘পুজো কমিটিগুলিকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে যাতে বিজেপির বিধায়কদের না ডাকা হয়। ডাকা হলে পুজোর অনুমতি, অনুদান দেওয়া হবে না। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হবে। তাই অনেকে ইচ্ছে থাকলেও আমাদের ডাকতে পারছে না।’ উদাহরণ দিয়ে নিখিলবাবু জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার কোচবিহারের পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়া কালচারাল ক্লাব দুর্গোৎসব কমিটির পুজোর উদ্বোধনের জন্য কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারপরই নানা জায়গা থেকে পুজো কমিটিকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে যাতে তিনি উদ্বোধনে না আসেন। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে বিজেপির বিধায়করা পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।
