নিউজ ইউ এ পি ডিজিটাল ডেস্ক – আমরা জীবন্ত ঈশ্বরকে পূজা করতে চাই। আমি সারা জীবন ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই দেখিনি ; তুমিও দেখনি। এই চেয়ারটাকে দেখতে হলে তোমাকে প্রথমে ঈশ্বর দেখতে হয়, তারপর তারই ভেতর দিয়ে চেয়ারটিকে দেখতে হয়। তিনি দিনরাত জগতে থেকে ‘আমি আছি, আমি আছি’ বলছেন। যে-মুহূর্তে তুমি বল ‘আমি আছি’, সেই মুহুর্তেই সেই সত্তাকে জানছ। কোথায় আমরা ঈশ্বরকে খুঁজতে যাব, যদি আমরা তাঁকে আমাদের হৃদয়ে, সমস্ত প্রাণীর ভিতরে না দেখতে পাই?
যদি একজনের মনে—এ সংসার-নরককুণ্ডের মধ্যে একদিনও একটু আনন্দ ও শান্তি দেওয়া যায়, সেইটুকুই সত্য, এই তো আজন্ম ভুগে দেখছি—বাকি সব ঘোড়ার ডিম।
সাক্ষাৎ ভগবান —মানবদেহধারী হরেক মানুষের পুজো করগে—বিরাট আর স্বরাট। বিরাটরূপ এই জগৎ, তার পুজো মানে তাঁর সেবা—এর নাম কর্ম। …ক্রোর টাকা খরচ করে কাশী-বৃন্দাবনের ঠাকুরঘরের দরজা খুলছে আর পড়ছে। এই ঠাকুর কাপড় ছাড়ছেন, তো এই ঠাকুর ভাত খাচ্ছেন, তো এই ঠাকুর আঁটকুড়ির বেটাদের গুষ্টির পিণ্ডি করছেন ; এদিকে জ্যান্ত ঠাকুর অন্ন বিনা, বিদ্যা বিনা মরে যাচ্ছে। বোম্বায়ের বেনেগুলো ছারপোকার হাসপাতাল বানাচ্ছে—মানুষগুলো মরে যাক। … পাগলাগারদ দেশময়।
প্রত্যেক নরনারীকে—সকলকেই ঈশ্বরদৃষ্টিতে দেখতে থাকো। তোমরা কাউকে সাহায্য করতে পার না, কেবল সেবা করতে পার। প্রভুর সন্তানদের, যদি সম্ভব হয়, স্বয়ং প্রভুর সেবা করো। যদি প্রভুর অনুগ্রহে তাঁর কোনও ধন্য। নিজেদের খুব বড় কিছুভেবো না। তোমরা ধন্য যে, সেবা করবার অধিকার পেয়েছ, অন্যে তা পায়নি। উপাসনাবোধে ঐটুকু করো। দরিদ্রদের মধ্যে আমি যেন ঈশ্বরকে দেখি—নিজের মুক্তির জন্যই তাদের কাছে গিয়ে আমি তাদের পুজো করব। কতগুলো লোক যে দুঃখ-দারিদ্রে কষ্ট পাচ্ছে, তা তোমার-আমার মুক্তির জন্য—যাতে আমরা রুগী, পাগল, কুষ্ঠী, পাপী প্রভৃতি রূপধারী প্রভুর পুজো করতে পারি।
প্রথম পুজো—বিরাটের পুজো, আমাদের চারপাশে যারা আছে তাদের পুজো। এদের ‘পুজো’ করতে হবে। … ‘পুজো’ শব্দটিই হচ্ছে ঠিক কথা। এ ছাড়া আর কোনও শব্দেই আমার অভিপ্রেত ভাবটা প্রকাশ করা যাবে না। এই সব মানুষ ও পশু—এরাই আমাদের ঈশ্বর, আর আমার স্বদেশবাসীরাই আমার প্রথম উপাস্য। পরস্পরের প্রতি দ্বেষ-হিংসা পরিত্যাগ করে, পরস্পর বিবাদ না করে প্রথমেই এই স্বদেশবাসীদের পুজো করতে হবে।
আমার কথা যদি শোন, তবে তোমাকে আগে তোমার ঘরের দরজাটি খুলে রাখতে হবে। তোমার বাড়ির কাছে, পাড়ার কাছে কত অভাবগ্রস্ত লোক রয়েছে, তোমায় তাদের যথাসাধ্য সেবা করতে হবে। যে পীড়িত, তাকে ঔষধপথ্য জোগাড় করে দিলে এবং শরীরের দ্বারা সেবাশুশ্রূষা করলে। যে খেতে পাচ্ছে না, তাকে খাওয়ালে। যে অজ্ঞান, তাকে—তুমি যে এত লেখাপড়া শিখেছ, মুখে মুখে যতদূর হয় বুঝিয়ে দিলে। আমার পরামর্শ যদি চাও বাপু, তাহলে এই ভাবে যথাসাধ্য লোকের সেবা করতে পারলে তুমি মনের শান্তি পাবে।
সমস্ত উপাসনার সার—শুদ্ধচিত্ত হওয়া এবং অপরের কল্যাণ করা। দরিদ্র, দুর্বল, রুগী—সবার মধ্যেই যিনি শিব দর্শন করেন, তিনিই ঠিক ঠিক শিবের উপাসনা করেন। আর যে কেবল প্রতিমার মধ্যে শিবের উপাসনা করে, তার উপাসনা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। যে কেবল মন্দিরেই শিব দর্শন করে, তার চেয়ে যে জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে একজন দরিদ্রকেও শিববোধে সেবা করে, তার প্রতি শিব বেশি প্রসন্ন হন।
